সুনামগঞ্জে ১৪শ পাসপোর্ট আটকে রাখায় বিদেশগামীদের চরম ভোগান্তি

মিজানুর রহমান, সুনামগঞ্জ: জাতীয় পরিচয়পত্রের দোহাই দিয়ে সুনামগঞ্জে ১ হাজার ৪০০ পাসপোর্ট আটকে রেখেছে পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষ। তাতে চরম ভোগান্তিতে বিদেশগামী যাত্রীরা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয়ের পরিপত্র মানছে না বলে অভিযোগ রয়েছে পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। সময়মত পাসপোর্ট না পাওয়ায় বিদেশ যেতে পারছেন না অনেকেই। আবার অনেকের ভিসা পেয়েও পাসপোর্ট না পাওয়ায় মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন এবং বিদেশ যাত্রা সম্ভব হচ্ছে না।

সুত্র জানায়, এনআইডি ভুল কিংবা গরমিলের কারণে সুনামগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসে অন্তত ১৪শত পাসপোর্ট আটকে আছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রবাসীদের রেমিটেন্স আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। আর মহামারী করোনা ভাইরাসের প্রভাব থাকা সত্বেও বিদেশে থাকা রেমিটেন্স যোদ্ধারা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে।

দেশে গত দুই বছর ধরে সরকারী কোন চাকুরী না পেয়ে উঠতি বয়সী যুবক-যুবতিরা আত্মকর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে ধার দেনা করে প্রবাসে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছেন সময়মত পাসপোর্ট না পাওয়ায়। অথচ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণায় থেকে এনআইডি ভুল কিংবা গরমিল পরিহার করে বিনা হয়রানীতে পাসপোর্ট দেয়ার নির্দেশনা জারি করলেও পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষ এনআইডি’র দোহাই দিয়ে মাসের পর মাস বছরের পর বছর পাসপোর্ট ইস্যু না করে আটকে রেখেছে। এ ছাড়াও পাসপোর্ট অফিসের বিরুদ্ধে রয়েছেন নানান হয়রানীর অভিযোগ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয় থেকে ইস্যূকৃত পত্রে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তথ্য সংশোধনপুর্বক দেশে-বিদেশে পাসপোর্ট রি-ইস্যুর আবেদন সমূহ দ্রুত নিস্পত্তি করনের নির্দেশনার পরিপত্রটি গত ২৮ এপ্রিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয়ের অতিরিক্ত সুচিব মো: আব্দুল্লাহ আল মাসুদ চৌধুরী কর্তৃক স্বাক্ষরিত হয়ে নির্দেশনা জারি করলেও সুনামগঞ্জ পাসপোর্ট অফিস কর্তৃপক্ষ মানছেন না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। পত্রের ভিত্তিতে পাসপোর্ট আবেদনকারীর নাম পিতার ও মাতার নাম এবং বয়স সংশোধনের জন্য প্রাপ্ত বয়স্কদের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র/জেএসসি/জেডিসি/এসএসসি/ এইচএসসি/ দাখিল/ কারিগরি/উন্মুক্ত বিশ^বিদ্যালয় সমমানের সনদপত্র বিবেচনা করতে করার নির্দেশনা থাকলেও তা আমলে না নিয়ে অনলাইনের দোহাই দিয়ে মাসের পর মাস বছরের পর বছর ঘুরানো হচ্ছে পাসপোর্ট প্রার্থীদের। অথচ যাদের এ ধরনের সনদপত্র নেই তাদের ক্ষেত্রে জন্ম সনদ বিবেচনা করার কথাও বলা হয়েছে। অপ্রাপ্ত বয়স্কদের ক্ষেত্রে জন্ম সনদ বিবেচনা করতে নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রয়োজনে স্পেশাল ব্রাঞ্চ ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে প্রদত্ত তথ্য যাচাই ক্রমে পাসপোর্ট দেয়ার নির্দেশনা রয়েছে। এ দিকে আবেদনে বয়স পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ বছরের ব্যবধান বিবেচনা করার নির্দেশনা রয়েছে। বিদেশে বসবাসরত নাগরিকরা পরিপত্র জারির ৬ মাসের মধ্যে তথ্য সংশোধনের আবেদন করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। এমআরপিতে কোন সংশোধনী না থাকলে রি-ইস্যু করার সময় পুলিশ ভেরিফিকেশন বাধ্যতামুলক নয় বলেও উল্লেখ করা হয়।

এ ছাড়াও পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে পাসপোর্টের পুলিশ প্রতিবেদনসহ রি-ইস্যুর আবেদন দাখিল করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আবেদনকারীকে তথ্য পরিবর্তনের জন্য লিখিত আবেদনের মাধ্যমে হলফনামা দাখিল করেও পাসপোর্ট দেয়ার নির্দেশনা রয়েছে। ভবিষ্যতে কোন আইনী জটিলতা হলে আবেদনকারী দায়ী থাকবেন মর্মে ঘোষনার কথাও বলা হয়েছে। অথচ এ ধরনের পরিপত্র জারি করার পরও সুনামগঞ্জের ১১ উপজেলার প্রায় ১৪০০ পাসপোর্টধারী বেকারত্ব গোছাতে ও পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে বিদেশে যেতে পারছে না। নির্ধারিত সময়ে পাসপোর্ট না পাওয়ায় অনেকে ধার দেনায় পড়তে হয়েছে। নষ্ট হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইর রাজাপুর গ্রামের হাসান মিয়া জানান, আমি গত বছরের নভেম্বর মাসে পাসপোর্ট করতে সরকারী ফি প্রদান পূর্বক সুনামগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসে জমা দিয়ে ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে আসি কিন্তু এখন পর্যন্ত আমার পাসপোর্টের পুলিশ তদন্তও আসেনি। আমার পাসপোর্টের হদিসও পাচ্ছি না। অতিরিক্ত টাকা না দেয়ায় আমার ফাইল গায়েব করেছে পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন গণমাধ্যমকর্মী তার নিজস্ব পাসপোর্ট পেতেও নানান হয়রানীর শিকার হয়েছেন।অথচ পূর্র্বে ইস্যুকৃত পাসপোর্টের মেয়াদ না থাকায় নতুনভাবে পূর্বের ন্যায় নতুন পাসপোর্টের আবেদন জমা দেয়ার দীর্ঘ তিন মাস পেরিয়ে গেলেও পাসপোর্ট পাচ্ছেন না। বার বার এনআইডি কার্ড সংশোধন করার কথা বলে পাসপোর্টটি ঢাকায় না পাটিয়ে সুনামগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসে আটকে রেখেছেন। গেল ২৭ জুন অনলাইনে পাসপোর্টের অবস্থান যাচাই করলে দেখা যায়, এনরোল্ড, পেন্ডিং এপ্রোভাল লিখা শব্দটি প্রদর্শিত হচ্ছে। এতে বুঝা যাচ্ছে যে, সুনামগঞ্জ পাসপোর্ট অফিস থেকে ই-পাসপোর্টটি অনুমোদন দেয়া হয়নি। এ অবস্থায চলতে থাকলে দেশের লাখো বেকার যুবক যুবতীরা বিদেশে যেতে পারবেন না এবং রেমিটেন্স আয় কমে যাবে।

ছাতক উপজেলার সিহাব উদ্দিন বিদেশ যেতে গত ১০ ফেব্রুয়ারী জরুরী পাসপোর্ট পেতে জরুরী ফি নির্ধারিত ব্যাংকে জমা দেন এবং গত ৪ঠা মার্চ পাসপোর্ট প্রদানের সময়সীমা বেধে দিলেও এখন পর্যন্ত পাসপোর্টটি পাচ্ছেন না। সিহাব উদ্দিন জানান, সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য আমার একটি ভিসা ইস্যু করা হয়েছিল। সময়মত পাসপোর্ট না পাওয়ায় সৌদি আরব যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
সুনামগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসের এক দালাল নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জানান, পাসপোর্ট অফিসে প্রতিটি পাইলের জন্য নগদ ১ হাজার টাকা না দিলে কাহারো কোন পাইল ঢাকায় পাঠানো হয় না এবং সেই ফাইলগুলোকে বেকেন্ড ফাইল হিসেবে চিহ্নিত করে আটকে রাখা হয়। সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ফি ও পুলিশ ভেরিফিকেশন আসার পরও শুধু অতিরিক্ত ১ হাজার টাকার কারণে পাসপোর্ট আটকে রাখা হয়। অফিসারদের সাথে ভাল সর্ম্পক থাকলেও নির্ধারিত সময়ের আগেই পাসপোর্ট পাওয়া যায়। তাদের বিরুদ্ধে লিখে কোন লাভ নাই। পাসপোর্ট অফিসের দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব নয়। আমাদের মাধ্যমে যারা আসবেন তাদের পাসপোর্ট সময়মতই পেয়ে যাবেন।

সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক মো: রফিকুল ইসলাম জানান, এনআইডি’র গরমিলের কারণে কতগুলো পাসপোর্ট আটকে আছে যা হিসেব না করে বলতে পারব না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয় থেকে জারিকৃত পরিপত্রের বিষয় জানতে চাইলে তিনি অনলাইনে পোষ্টিং নিচ্ছেনা বলে জানিয়ে দেন। প্রতিটি ফাইলের জন্য ১ হাজার টাকা অতিরিক্ত নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অস্বীকার করে জানান, আমার অফিসের কোন স্টাফ এ ধরনের কাজের সাথে জড়িত থাকলে তথ্য প্রমাণসহ অভিযোগ দাখিল করলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Share Button