৬শ’ পরিবারকে ফ্ল্যাট দিলেন প্রধানমন্ত্রী

ঢাকা: কামিনী, হাসনাহেনা, গন্ধরাজ এমন ফুলের নামে নামকরণ করা হয়েছে ভবনগুলোর। চারপাশের পরিবেশটাও নয়নাভিরাম। সমুদ্রদ্বীপ কুতুবদিয়া ও পাশের মহেশখালীতে ১৯৯১ সালে সাগরজলে ভিটেমাটি হারানো জলবায়ু উদ্বাস্তু মানুষদের জীবনে এটা স্বপ্নের চেয়েও বড় কিছু। সব হারিয়ে কক্সবাজারে এসে তারা বেছে নিয়েছিলেন বস্তিজীবন, সেই বস্তি থেকেই বিমানবন্দর সম্প্রসারণের কারণে আবার হয়েছেন উচ্ছেদ। তবে অবাক ব্যাপার হচ্ছে, এবার উচ্ছেদ হয়েও ঠিকানাহারা না হয়ে তারা পেয়ে যাচ্ছেন কল্পনাকেও হার মানানো ঘটনার মতো ফ্ল্যাটের চাবি। আর তাদের এই ফ্ল্যাট উপহার দিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 

বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী এর উদ্বোধন করেন। এর মাধ্যমে ৬শ’ জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারের জন্য দরজা খুললো বহুল প্রতিক্ষিত স্থায়ী আবাসের। 

উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে কক্সবাজার এয়ারপোর্ট এলাকার কুতুবদিয়া পাড়ায় জলবায়ু উদ্বাস্তু হিসেবে বসবাস করে আসছিলেন তারা। পাতলা পলিথিন, শন, নারিকেল পাতা মুড়িয়ে তৈরি করা খুপড়িতে থাকতেন পরিবার নিয়ে। প্রায় ৩০ বছর পর স্থায়ী আবাসন পেয়ে সাঝ সাঝ রব পড়ে গেছে। পুরো পাড়াজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশে মেতে ওঠেছে শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সর্বস্তরের মানুষ।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের খুরুশকুলে বাঁকখালী নদীর তীরে ২৫৩ একর জমির উপর গড়ে ওঠা এই বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্পে প্রথম পর্যায়ে নির্মিত হয়েছে পাঁচ তলার ১৯টি ভবন। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ১৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই আশ্রয়কেন্দ্রে মোট ১৩৯টি ভবন নির্মাণ করা হবে। প্রতিটি পাঁচতলা ভবনে থাকছে ৪৫৬ বর্গফুট আয়তনের ৩২টি করে ফ্ল্যাট। প্রতিটি ফ্ল্যাটে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস সিলিন্ডারের সুবিধা থাকবে। প্রতিটি ভবনে থাকবে সৌর বিদ্যুতের প্যানেল।

প্রকল্প পরিচালক মো. মাহবুব হোসেন জানান, প্রকল্প এলাকায় ১৪টি খেলার মাঠ, সবুজ জায়গা, মসজিদ, মন্দির, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পুলিশ ও ফায়ার স্টেশন, তিনটি পুকুর, নদীতে দুটি জেটি, দুটি বিদ্যুতের সাবস্টেশন থাকবে।

এছাড়াও থাকবে ২০ কিলোমিটার অভ্যন্তরীণ রাস্তা, ৩৬ কিলোমিটার ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বর্জ্য পরিশোধন ও নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা, তীর রক্ষা বাঁধ, ছোট সেতু, পুকুর ও খাল।

প্রকল্প পরিচালক আরো জানান, আশ্রয়ণ প্রকল্পে যারা ফ্ল্যাট পাবেন তাদের ঋণ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা হবে। প্রকল্প এলাকায় একটি শুঁটকি মহালও থাকবে এবং এখানে পর্যায়ক্রমে বিক্রয় কেন্দ্র ও প্যাকেজিং শিল্পও গড়ে তোলা হবে। ২০২৩ সালে পুরো প্রকল্পের যখন শেষ হবে, তখন এখানে যে কেবল ৪ হাজার ৪০৯টি পরিবার আশ্রয় পাবে, তা নয়। প্রায় ১০০ একর জমির ওপর গড়ে তোলা হবে আধুনিক পর্যটন জোন।

ভবনগুলোর নাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই রেখেছেন। ভবনগুলো হলো— দোঁলনচাপা, রজনীগন্ধা, গন্ধরাজ, হাসনাহেনা, কামিনী, গুলমোহর, গোলাপ, সোনালী, নীলাম্বরী, কেওড়া, ঝিনুক, কোরাল, মুক্তা, প্রবাল, সোপান, মনখালী, শনখালী, বাঁকখালী, ইনানী ও সাম্পান।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আনন্দের উৎসবে মেতে উঠেছে কুতুবদিয়া পাড়া। কেউ আনন্দে চোখের পানি ফেলছেন। কেউবা উজ্জ্বল চোখে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা আঁকছেন। এক কোনায় বসে মাথায় টুপি দিয়ে বসে আছেন নজির হোসাইন। তার সাথে কথা বলতে গেলে বাকরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, আমরা বন্যা এলাকায় ছিলাম। এখানে একটু বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায়। নিজেদেরকে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু বলে মনে হতো। নিয়তিকে মেনেও নিয়েছিলাম। পরিবার নিয়ে খুপড়ির মাঝে জীবনযাপন করছিলাম। এখান থেকে হঠাৎ টেনে নিয়ে পাঁচতলায় তুলে দিলেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী।

কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা খুঁজে না পাওয়া মৎস্যজীবী আব্দুল হক বলেন, ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে আমরা নিজেদের আবাসে ফিরতে পারবোনা, এমনটা ভাবতেই কান্না পেয়ে যেতো। সেখানে আমার অনেক ব্যবসায়, জায়গা-জমি ছিল। সব হারিয়ে হতাশ হয়ে পড়ি। এখানে এসে আয়-ইনকামের পথও সহজে পাচ্ছিলাম না। অবশেষে মাছ ধরাকেই পেশা হিসেবে নিয়ে দু-বেলা খেয়ে পরে বেঁচেছিলাম। কিন্তু এখন স্বপ্ন দেখছি। আমার সন্তানরাও ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার সুযোগ পাবে।

Share Button