১১ বছর ধরে মুক্তিযোদ্ধার ভাতা আত্মসাৎ

সুনামগঞ্জ: প্রয়াত এক মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীর ভাতা তুলে অর্ধেক দেওয়া হচ্ছে। বাকি অর্ধেক আত্মসাৎ করছেন আরেক মুক্তিযোদ্ধা। সুনামগঞ্জে এটা ঘটছে বিগত ১১ বছর ধরে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতারা এ কথা শুনে হতবাক হয়েছেন।

আমাদের ফেইসবুক পেজ এ লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন।

সুনামগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রাপ্ত কাগজপত্র থেকে দেখা গেছে, সদর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা নাঈমুল্লাহ প্রায় ১৫ বছর আগে প্রয়াত হয়েছেন। তাঁর স্ত্রী মোকসেদা বেগমের অসহায় অবস্থা জেনে পৈন্দা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা জায়ফর আলী ভাতার ব্যবস্থা করেন। ২০০৯ সালে ভাতা দেওয়া শুরু হয়। তখন থেকে ভাতার বই ও চেক বই জায়ফর রাখেন। ভাতা তোলার দিন তিনি মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ব্যাংকে যান। ভাতা তোলার পর তিনি ভাতার কাগজ, চেক বই ও টাকা নেন। অর্ধেক রেখে টাকা দিয়ে ওই নারীকে বিদায় করেন।

সম্প্রতি ঈদ বোনাস, বৈশাখী ভাতাসহ ৪৮ হাজার টাকা সুনামগঞ্জ সোনালি ব্যাংকে গিয়ে তোলেন। টাকা তোলার আগে বরাবরের মতো ভাতার বই ও চেক বুঝিয়ে লাইনে ঢুকিয়ে দিয়ে তিনি অপেক্ষায় ছিলেন। ভাতা তোলার সঙ্গে সঙ্গে জায়ফর আবারও বই দুটি এবং টাকা হস্তগত করেন। বাইরে এনে মোকসেদাকে ১৬ হাজার টাকা দিয়ে বিদায় করেন। এ সময় বিষয়টি জানেন মোকসেদার ভাগ্নে রাজু আহমদ। তিনি ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি রইছুজ্জামানকে সঙ্গে নিয়ে জায়ফর আলীর বাড়িতে যান। খালার চেক ও ভাতা বই দেওয়ার অনুরোধ করেন। কী কারণে প্রতি মাসে অর্ধেক টাকা দেন জানতে চান। এ কথা শুনে মুক্তিযোদ্ধা তাঁদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন।

এদিকে সরেজমিনে গত সোমবার ভৈষবেড় গ্রামে গিয়ে জানা যায়, ওই নারী ২০১৭ সালে সরকার থেকে আট লাখ ৪০ হাজার টাকার একটি ঘরের বরাদ্দ পান। ওই ঘর বাবদ জায়ফর আলী ও সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক সভাপতি তাঁর কাছ থেকে ৮০ হাজার টাকা নেন। মুক্তিযোদ্ধা সনদ না আনলে ভাতা বন্ধ হয়ে যাবে—এই ভয় দেখিয়ে আরো ৩০ হাজার টাকা নেন। ঘর তৈরির সময় রড, সিমেন্টসহ অন্যান্য উপকরণ নৌকায় ভরে নিয়ে যান জায়ফর আলী। পরে ঘর নির্মাণে রড-সিমেন্টের টান পড়ে। এ কারণে এখন ঘরের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ছে। এ ছাড়া গত বছর মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী জরুরি প্রয়োজনে তিন লাখ টাকার ঋণ তোলেন ব্যাংক থেকে। এই ঋণের ২৫ হাজার টাকা জায়ফর আলী ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ওই নেতা নেন।

মুক্তিযোদ্ধার কন্যা কল্পনা বেগম বলেন, ‘আমি ভাতা তোলার সময় মাইর লগে যাতইতাম ছাই। জায়ফর সাব আমারে নেইনন্যা। খইন তাইরে আনলে সমস্যা অইব। আমি মাতলে তাইন হুমকি দেইন বাবার নাম খাইট্যা দেলাইবা। জায়ফর সাব আর মজিদ সাব মিইল্যা আমরার টেকা-পয়সা খায়রা।’

ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি রইসুজ্জামান বলেন, ‘জায়ফর আলী আমাকে জানান, ভাতা তুলে অর্ধেক ঘুষ দেন।’

অভিযুক্ত মুক্তিযোদ্ধা জায়ফর আলী বলেন, ‘ভাতার বই, চেক বই, আমার কাছে থাকে। আমি ভাতা তুলে টাকা দিয়ে দিই।’

এদিকে প্রতারণার বিষয়টি জেনে সুনামগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক সদস্যসচিব মালেক হুসেন পীর, মোহনপুর ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতা সমির উদ্দিন ও সরদারপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আমির উদ্দিন গত সোমবার ঘটনাস্থলে যান। মুক্তিযোদ্ধা সমির উদ্দিন বলেন, ‘যা শোনলাম, নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছি না।’

সুনামগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক সদস্যসচিব মালেক হুসেন পীর বলেন, ‘এমন ঘটনায় আমরা লজ্জিত।’

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াসমিন নাহার রোমা বলেন, ‘এমন ঘটনা খুবই নিন্দনীয়। আমাকে সব তথ্য দিন, এখনই আমি মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীর কাগজপত্র উদ্ধার করে দেব।’

Share Button