শ্রীমঙ্গলে ১১ হাজার টাকা কেজি দরে চা বিক্রি

মোঃ আব্দুর র‌হিম: শ্রীমঙ্গ‌লে বহুল প্রতিক্ষীত চা’য়ের রাজধানী খ্যাত শ্রীমঙ্গলে চায়ের প্রথম নিলাম ১১ হাজার টাকা কেজিতে বিক্রিয় হয়েছে। আর সেটি কিনে নেন দেশে প্রতিষ্টিত চা ব্যবসায়ি প্রতিষ্ঠান ইস্পাহানী চা কোম্পানীর চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর মির্জা সালমান ইস্পাহানি। আর সেটি তারই ইস্পাহানী জেরিন বাগানে চা।

জানা যায়, আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগে ১৯৪৯ সালে চট্টগ্রামে চায়ের প্রথম নিলাম যখন হয়েছিল তখন এই ইস্পাহানী চা কোম্পানীই প্রথমে নিলামে অংশ গ্রহণ করেছিল। এই অকশন কার্যক্রমের সাথে সিলেট বাসীর ৭০ বছরের দাবী ও স্বপ্ন এবং একই সাথে বাস্তবায়িত হলো জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষনা।

সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দি‌কে সিলেটবাসীর বহুল প্রতিক্ষিত শ্রীমঙ্গল শহরের মৌলভীবাজার রোডস্থ খাঁন টাওয়ারের দ্বিতীয় তলায় স্থাপিত অকশন সেন্টারে দেশের দ্বিতীয় নিলাম কেন্দ্রের প্রথম কার্যক্রম শুরু হয়। শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত টি প্ল্যান্টার অ্যান্ড ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টিপিটিএবি) পরিচলনায় বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আর মুস্তাহিদুর রহমান পিএসসি নিলাম কার্যক্রম শুরু করেন।

এ সময় অন্যদের মধ্যে এমএম ইস্পাহানি চা কোম্পানির চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর মির্জা সালমান ইস্পাহানি, ফিনলে টি’র চিফ অপারেটিং অফিসার এএম শামসুল মহিত চৌধুরী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

নিলামের শুরুতেই ইস্পাহানীর জেরিন চা বাগানের প্রতি কেজি ১১ হাজার টাকা দরে কিনে নেন ইস্পাহানী চা কোম্পানীর চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর মির্জা সালমান ইস্পাহানি। এই দরে ২২০ নং লটে ৫৮৪ কেজি ৫শ’ গ্রাম চা কিনে নেন তিনি। এছাড়াও নিলামে সর্বনিন্ম ১৮৫ টাকা কেজি ধরে চা পাতা বিক্রয় হয়।

দুপুর ২টায় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিজ দপ্তর থেকে শ্রীমঙ্গল নিলাম কার্যক্রমের অনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ভিডিও কনফারেন্সে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন, এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। আজ চায়ের নিলাম শুরু হওয়া তিনি সস্তোষ প্রকাশ করে বলেন এতে প্রধানমন্ত্রী ঘোষনা বাস্তবায়িত হলো।
পরে সাংবাদিকদের প্রেসবিফ্রিং করেন চা নিলামে সাথে জড়িত সাবেক জাতিসংঘের রাষ্ট্রদুত মো. আব্দুল মুমিন। আজকের এই কার্যক্রম টি বাস্তবায়িত হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কারণে তার ঐকান্তি চেষ্ঠায় এবং এতে সর্বাত্মক সহযোগীতা করেন অর্থমস্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। তিনি আশাবাদী।

চায়ের নিলাম শুরু হয়েছে। তারা প্রথমেই ভালো কিছু আশা করেননি। তিনি আরো বলেন এরপর অনেক ভালো হয়েছে। সাড়ে ৬ লক্ষ কেজি চা বিক্রিয় হয়েছে। টেকনিক্যাল, অবকাঠামোসহ অনেক কিছু ঘাড়তি রয়েছে। আস্তে আস্তে সমাধান হবে। তার অনেক স্বপ্ন আছে। রাস্তা ঘাটের অবস্থা ভলো না, ৩ ঘন্টায় যাতে ঢাকা পৌছাতে পারেন, এমন ব্যবস্থা চান। প্রতিমাসে শ্রীমঙ্গলে একটি করে চায়ের নিলাম অনুষ্ঠিত হবে।

তিনি আরো জানান, দেশে প্রতি বছর ১৭ হাজার কোটির টাকার চায়ের নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। এর দ্বারাবাহিকতা বজায় রাখলে ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

টি প্ল্যান্টার অ্যান্ড ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের শ্রীমঙ্গল এর সদস্য সচিক জহর তরফদার জানান, নিলামে ৫ লক্ষ ৫৭ হাজার কেজি চা পাতা বিক্রি হয়। যার বাজার মুল্যে প্রায় ১২ কোটি টাকার উপরে।

সময় উপস্থিত ছিলেন সাবেক সহকারী সচিব (বানিজ্য) মো. আব্দুর রউফ, সাবেক অতিরিক্ত সচিব বণমালি ভৌমিক, মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম, মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল আজিজুর রহমান, জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি মো. নেছার আহমদ, সাধারণ সম্পাদক মিজবাহুর রহমান, কেরামতনগর চা বাগানের মালিক নুরুল ইসলাম চৌধুরী, এম আর খান চা বাগানের মলিক আলহাজ্ব সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও টি প্ল্যান্টার অ্যান্ড ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের শ্রীমঙ্গল এর সদস্য সচিক জহর তরফদার প্রমুখ।

কেরামতনগর চা বাগানের মালিক নুরুল ইসলাম চৌধুরী তার প্রতিক্রিয়ায় জানান, তাদের কাছে আজকের এই দিনটি ঈদের খুশীর মতো মনে হয়েছে। তারা চা বাগান মালিকরা দীর্ঘদিন যাবৎ এই দিনের অপেক্ষায় ছিলেন। আজকে তাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলো।

চা নিলাম কার্যক্রমে ন্যাশনাল ব্রোকার্স, পূর্ববাংলা ব্রোকার্স, কেএস ব্রোকার্স, প্রোডিউস ব্রোকার্স, প্রোগ্রেসিভ ব্রোকার্স, ইউনিটি ব্রোকার্স এবং প্লান্টার ব্রোকার্স অংশ নেয়।

উল্লেখ্য, ১৮৪৯ সালে সিলেটের মালনিছড়ায় বাগান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উপমহাদেশে চা উৎপাদনের সূচনা হয়। এরপর সিলেট অঞ্চলে এ শিল্পের ক্রমশ বিকাশ ঘটে। বর্তমানে সিলেট জেলায় ২০টি, মৌলভীবাজারে ৯৩টি এবং হবিগঞ্জ জেলায় ২২টি চা বাগান রয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রতি বছর গড়ে সাত কোটি কেজি চা উৎপাদন হয়। এর মধ্যে সিলেট অঞ্চলে উৎপাদন হয় প্রায় ছয় কোটি কেজি চা, যার ৭৫ শতাংশই উৎপাদন হয় মৌলভীবাজারের বাগানগুলোয়।

দেশের সিংহভাগ চা উৎপাদনে সিলেট অঞ্চলের একক আধিপত্য থাকলেও পণ্যটির আন্তর্জাতিক নিলাম কেন্দ্রের অবস্থান চট্টগ্রামে। সিলেট থেকে উৎপাদিত চা চট্টগ্রাম নিয়ে এর পর তা নিলামে তোলেন সংশ্লিষ্টরা। এ কারণে মান কমার পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় যুক্ত হওয়ায় চায়ের দাম বেড়ে যায়। এ সমস্যা সমাধানে দীর্ঘদিন থেকে মৌলভীবাজারে শ্রীমঙ্গলে চায়ের নিলাম কেন্দ্র স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন সংশ্লিষ্টরা।

অবশেষে তাদের দাবি পূরণ হলো। টিপিটিএবি’র সদস্য সচিব জহর তরফদার বলেন, প্রায় দেড় শতাধিক বায়ার এই নিলাম কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন।

Share Button