শেখ হাসিনা উড়াল সড়কে ভাগ্য খুলবে হাওরবাসীর

*নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন চলতি মাসে *প্রকল্পের প্রাথমিক প্রাক্কলন ব্যয় সাড়ে ৩ হাজার কোটি, সম্ভাব্য মেয়াদ ২০২৫ সালবিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হবেএই উড়াল সড়ক দিয়ে নেত্রকোনা হয়ে ঢাকায় চলে যেতে পারবে।

মিজানুর রহমান রুমান, সুনামগঞ্জ: বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর থেকে গোপালগঞ্জ আর সুনামগঞ্জকে একই চোখে দেখার নজির সৃষ্টি করেছেন। প্রধানমন্ত্রী কথায় নয় বাস্তবেও সেই প্রমান দিচ্ছেন হাওরবাসীকে।

২০১১ সালে জেলার তাহিরপুরে এক কৃষক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন গোপালগঞ্জ আর সুনামগঞ্জ আমার কাছে সমান। উন্নয়ন ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া হাওরবাসীর উন্নয়নে আন্তরিকভাবে কাজ করতে চাই। বঙ্গবন্ধু কন্যা হাওরবাসীকে যে কথা দিয়েছিলেন সেই কথা গুলো রেখে হাওরপাড়েরর মানুষের ভরসাস্থল হয়ে উঠেছেন। প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীপরিষদে সুনামগঞ্জের কৃতি সন্তান, হাওররত্ন, সাবেক সচিব ও সুনামগঞ্জ-৩ আসনের বার বার নির্বাচিত সাংসদ এম এ মান্নানকে পরিকল্পনা মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বে দিয়ে হাওরবাসীর স্বপ্ন পুরণের দ্বার উম্মোচন করেন।

এম এ মান্নান পরিকল্পনামন্ত্রনায়ের দায়িত্ব পাওয়ার সাথে সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করারও দায়িত্ব দেন। পরিকল্পনামন্ত্রী ইতমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ট্রেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউট, নার্সিং ইন্সটিটিউট, বিআরটিএ ট্রেনিং সেন্টার, ম্যাট্স, সুনামগঞ্জের পাগলা-রানীগঞ্জ-আশারকান্দি সড়কের রানীগঞ্জ সেতুসহ বিপুল উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন। এ ছাড়াও ছাতকের সুরমা সেতু, বিশ্বম্ভরপুরের ফতেহপুর আবয়া সেতুর পূণ: নির্মান কাজ শুরু করেন।

সুনামগঞ্জ সিলেট সড়ক প্রশস্ত করণের প্রায় ৭০ভাগ সম্পন্ন হয়েছে। এরই ধারবাহিকতায় হাওরবাসীর স্বপ্ন পুরণে সুনামগঞ্জ-নেত্রকোনা মহাসড়কেরর মান্নানঘাট থেকে গুল্লা গ্রাম হয়ে ধর্মপাশার মধুপুর পর্যন্ত সাড়ে ১০ কি:মি: স্থানে গভীর হাওরে উড়াল সেতুসহ রাস্তা নির্মান এবং দিরাই-শাল্লা সড়ক নির্মান প্রকল্পটি চলতি মাসেই একনেকের সভায় অনুমোদন করা হবে। এই প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে সুনামগঞ্জ থেকে নেত্রকোনা এবং নেত্রকোনা থেকে ঢাকা পর্যন্ত অল্প সময়ে স্বল্প খরচে আসা যাওয়া সম্ভব হবে হাওরবাসীর।

সুত্র জানায়, এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে সরকারের সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। প্রকল্পের সম্ভাব্য মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৫ সাল পর্যন্ত। এই প্রকল্পে প্রায় ১০৭ কি.মি. দৃষ্টিনন্দন সড়ক নির্মিত হবে। আরও ২৮ কি.মি. ডুবন্ত সড়ক, ইউনিয়ন ও উপজেলা সড়ক সংযোগ থাকবে।

উপজেলা সড়কে ২ হাজার ৯৮৭ মিটার ও ইউনিয়ন সড়কে ৬৮৫ মিটার সেতু এবং ৭৭৫ মিটার কালভার্টও নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের সবকিছুই হবে দৃষ্টিনন্দন ও চোখ ধাঁধানো। প্রকল্পটি চলতি মাসেই একনেকে অনুমোদিত হওয়ার আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কারণ হাওরের প্রকৃতি বিবেচনা করেই বিরল উড়াল সড়ক নির্মাণের কাজ প্রধানমন্ত্রীর মাথা থেকেই এসেছে।

সুত্র আরও জানায়, উড়াল সড়কের প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে হাওরাঞ্চলের মানুষের ব্যবসা ও পর্যটনের দ্বার উম্মোচিত হবে। সহজেই দেশ-বিদেশ থেকে পর্যটকরা সুনামগঞ্জে প্রবেশ করে হাওরের উড়াল সড়ক দিয়ে নেত্রকোনা হয়ে ঢাকায় চলে যেতে পারবে। এই প্রকল্পের কাজ শেষ হলে বেসরকারি উদ্যোক্তারা হোটেল-মোটেল নির্মাণ, হাওরে ঘুরার জন্য নৌকা-স্পিডবোটসহ নানা জলযান তৈরী করবে এবং হাওর পাড়ের মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হবে।

সরকারিভাবে উড়াল সড়কের দুই পাশে কিছু দূর দূর ‘ইয়ূথ হোস্টেল’ গড়ে তোলা হবে। টিনসেডের বাংলো টাইপের হোস্টেলও থাকবে। সেখান থেকে দেখা যাবে হাওরের প্রাকৃতিক মনোরম দৃশ্য। সেই সাথে হোস্টেলগুলোতে নিরাপদ পানি ও রান্নাবান্নার ব্যবস্থা থাকবে। ‘হাওর এলাকায় গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্প নিয়ে এখন কাজ চলছে পুরোদমে।

সূত্র জানায়, এ প্রকল্পের প্রাথমিক প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয়েছে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা। ইতোমধ্যে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে বৈঠকও করেছেন। প্রকল্পের বিভিন্ন দিক যাছাই-বাছাই কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী একান্ত চিন্তা-ভাবনা থেকে হাওরে উড়াল সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। যার কারণে উড়াল সড়কটির নাম হবে ‘শেখ হাসিনা উড়াল সড়ক’। একনেকে অনুমোদনের পর নামকরণের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হবে। দিরাই থেকে শাল্লা, আজমিরিগঞ্জ-বানিয়াচং-হবিগঞ্জ হয়ে হাওরের বুক চিরে একটি মহাসড়ক নির্মাণ প্রকল্প একনেকে পাশ হওয়ার পর কাজও শুরু হয়ে গেছে। মোহনগঞ্জ-নেত্রকোণার সঙ্গে একটি এবং দিরাই-হবিগঞ্জের সঙ্গে আরেকটি মহাসড়ক হলে হাওরের যোগাযোগ চিত্র পাল্টে যাবে।

প্রকল্প সূত্রে আরও জানা যায়, ১৯০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে উপজেলা অল সিজন সড়ক ১০৬ দশমিক ৫৮ কি.মি., উপজেলা সাব-মারজিবল সড়ক ২৮ দশমিক ২১ কি.মি, ইউনিয়ন অল সিজন সড়ক ১৯ দশমিক ২০ কি.মি, ইউনিয়ন সাব-মারজিবল সড়ক ১৪ দশমিক ৬৯ কি.মি, গ্রাম সাব-মারজিবল সড়ক ৮ দশমিক ১৭ কিলোমিটার এবং উপজেলা এলিভেটেড (উড়াল) সড়ক ১৩ দশমিক ৪১ কিলোমিটার। পাশাপাশি উপজেলা সড়কে ২ হাজার ৯৮৭ মিটার ব্রিজ, ইউনিয়ন সড়কে ৬৮৫ মিটার ব্রিজ, উপজেলা সড়কে ৬৬৭ মিটার কালভার্ট, ইউনিয়ন সড়কে ৭৫ মিটার কালভার্ট এবং গ্রাম সড়কে ৩৩ মিটার কালভার্ট নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খান জানান, সুনামগঞ্জ বাংলাদেশের অন্যান্য স্থানের মতো নয়। হাওরের কারণে এই জেলার অধিকাংশ উপজেলা সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এসব উপজেলার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে অনেগুলো প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে হাওরবাসীকে আর উন্নয়নে পিছিয়ে থাকতে হবে না। প্রধানমন্ত্রী হাওরবাসীর উন্নয়নে যা যা করা দরকার তাই করতে নির্দেশনা দিয়েছেন।
স্থানীয় সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন জানান, ২০১১ সালে বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাহিরপুরের কৃষক সমাবেশে হাওরবাসীর সার্বিক উন্নয়নে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তারই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে হাওরের মেঘা প্রকল্প হাতে নিয়েছেন।

সুনামগঞ্জের কৃতি সন্তান, হাওর রত্ন ও পরিকল্পনামন্ত্রী আলহাজ্ব এম এ মান্নান এমপি জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাওরবাসীকে ভালবাসেন বিধায় বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে আমাকে পরিকল্পনা গ্রহন করতে নির্দেশনা দিয়েছেন। আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ পালন করছি। এ সব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সুনামগঞ্জকে আর অবহেলিত জেলা হিসেবে আখ্যায়িত করবে না। সুনামগঞ্জ হবে পর্যটকদের জন্য উত্তম স্থান। দেশ-বিদেশ থেকে হাজারো পর্যটক ও প্রাকৃতিক প্রেমিরা ছুটে আসবেন এবং হাওর পাড়ের মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সম্পাদনায়: মোন/ মোমিন।

Share Button