‘রাজনীতিবিমুখ’ প্রজন্মকে ফেরানোর চ্যালেঞ্জ যুবলীগের নতুন চেয়ারম্যান পরশের

ডেস্ক রিপোর্ট : প্রথমবারের মতো রাজনীতির ময়দানে পা রেখে দেশের ‘রাজনীতিবিমুখ’ প্রজন্মকে ‘স্বাধীনতার মন্ত্রে’ উজ্জীবিত করার চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ। – এনটিভি

শনিবার দিনভর যুবলীগের সপ্তম জাতীয় কংগ্রেসের উদ্বোধন পরবর্তী যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মণির জ্যেষ্ঠ পুত্রের নাম নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়।

মঞ্চে দাঁড়িয়েই লিখিত বক্তব্যে নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান বলেন, ‍“আমার চেষ্টা থাকবে যুবসমাজ যেন ‘আই হেইট পলিটিকস’-কালচার থেকে বেরিয়ে এসে ‘জয় বাংলা-জয় বঙ্গবন্ধু’ বলে নিজেদের কাজে নিয়োজিত করবে।”

‘আমাদের এখন থেকে একটাই পরিচয় আমরা বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের কর্মী’, বলেন বঙ্গবন্ধু পরিবারের এই সদস্য।

সকালে রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে ‘ভাবমূতির সংকটে থাকা’ যুবলীগের কংগ্রেসের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় মঞ্চেই ছিলেন রাজনীতিতে একেবারে নতুনভাবে পা রাখা রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান পরশ।

পরে বিকেলে পাশের ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের মিলনায়তনের বসে কাউন্সিল অধিবেশন। সেখানে সারাদেশ থেকে আসা নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দলের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য জড়ো হন। সেখানে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য বেশ কয়েকজনের নাম আসলেও চেয়ারম্যান পদের জন্য একমাত্র ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক শেখ ফজলে শামস পরেশর নামই আসে।

পরশ, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকের গুলিতে প্রাণ হারানো শেখ ফজলুল হক মনি ও আরজু মনির প্রথম সন্তান। সেসময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর। আর ছোট ভাই শেখ ফজলে নূর তাপসের বয়স ছিল তিন বছর। তাপস আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার হাত ধরে এক দশক আগেই রাজনীতিতে পা রাখলেও পরশ নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা আর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পরিমণ্ডলেই।

বাবা-মায়ের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড, তার প্রভাব যে পরশের মননে গভীরভাবে রেখাপাত করেছিল এবং রাজনীতি থেকে তাঁকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল, সেই অনুভূতির কথাও বলেছেন যুবলীগের নতুন চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, ‘আমি একজন শহীদের সন্তান। ছোটবেলায় রাজনীতি আমি এবং আমার ভাই শেখ ফজলে নূর তাপসের কাছ থেকে অনেক কিছু, বলতে গেলে সবকিছুই কেড়ে নিয়েছে। ছোটবেলায় হারিয়েছি আমার মা-বাবা ও অন্যান্য স্বজনদের। আমাদের দু:খ শুধু শেখ রেহানা ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাই অনুধাবন করতে পারেন।’

‘তাই, আমি রাজনীতি থেকে অনেক দূরে ছিলাম। কারণ যে মানুষ (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) জাতির জন্য এত ত্যাগ শিকার করেছেন, তাঁকে যখন এত নির্মমভাবে ষড়যন্ত্রকারীরা হত্যা করতে পারল, তাতে আমার আশাহত হওয়াটাই স্বাভাবিক। তারপরও বঙ্গবন্ধুর ত্যাগ ও তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার দেশের প্রতি উদার ভালোবাসা দেখে আমি সাহস পাই।’

রাজনীতিতে নতুন হলেও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সৎ থাকবেন, সততার পরিচয় দেবেন বলে অঙ্গীকার করেছেন যুবলীগ চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘যুবলীগের একজন সভাপতি হিসেবে নয়, একজন কর্মী হিসেবে আপনাদের কাছে থেকে দায়িত্ব পালন করব। আপনারা আমার শক্তি হবেন, আপনারা আমাদের শক্তি হবেন।’

মাস দুয়েক আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজধানীতে দুর্নীতি ও ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু করলে প্রভাবশালী যুবলীগের নেতাদের এসবে জড়িত থাকার অভিযোগ আসতে থাকে। একে একে গ্রেপ্তার হন যুবলীগের অনেক কেন্দ্রীয় নেতাই। একপর্যায়ে অব্যাহতি দেওয়া হয় দলের চেয়ারম্যানকেও। প্রভাবশালী অনেকে নেতা বিদেশে পাড়ি দেন, অনেকে হন ফেরারী। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই ক্ষমতাসীনদের প্রভাবশালী এই সংগঠনটি ‘ভাবমূর্তির সংকটে’ পড়ে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে যুবলীগের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধুঘোষিত ‘দ্বিতীয় বিপ্লবের’ সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ‘স্বাধীনতার পর পর দেশি-বিদেশি যে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল, তা প্রতিহত করার জন্যই এ সংগঠন কাজ করেছে। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন। কিন্তু ১৫ আগস্টের ষড়যন্ত্রের কারণে সেই বিপ্লব সফল হয় নাই। আজকে প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে জিরো টলারেন্স কর্মসূচি দিয়েছেন, এই কর্মসূচিকে আমি বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি হিসেবে দেখি।’

শেখ ফজলে শামস পরশের সঙ্গে  যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন মাইনুল হোসেন খান নিখিল। তিনি আগে যুবলীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি ছিলেন। মঞ্চ থেকে তাদের নাম ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এর আগে যুবলীগের চেয়ারম্যান হিসেবে শেখ শামস পরশের নাম প্রস্তাব করেন সংগঠনের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায় চয়ন ইসলাম। তা সমর্থন করেন সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ।

শেখ ফজলে শামস পরশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেন। পরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়াশোনা করেন। পঞ্চাশোর্ধ পরশ বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। তাঁর ছোট ভাই ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকার আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য।

১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে শেখ ফজলে শামস পরশের বাবা শেখ ফজলুল হক মণি বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। মণির ছোটভাই শেখ ফজলুল করিম সেলিমও দীর্ঘসময় চেয়ারম্যান হিসেবে যুবলীগকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চার মূল নীতিকে সামনে রেখে যুবলীগের মূল কাজ বেকারত্ব দূরীকরণ, দারিদ্র্য দূরীকরণ, দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা সম্প্রসারণ, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ ও আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তোলা। পাশাপাশি যুবসমাজের ন্যায্য অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠা করা।

Share Button