ফেসবুকের কারণে ভাঙ্গছে সংসার!

প্রতিদিন২৪ ডেস্ক: ধরুন কোনো একভাবে কিংবা ভুলক্রমে আপনার প্রিয় মানুষটির ফেসবুক আইডিতে এক্সেস পেয়ে গেলেন আপনি। হয়তো ইনবক্স চেক করতে গিয়ে পেয়ে গেলেন যে আপনার সঙ্গী বা সঙ্গিনী মানুষটি খুবই অন্তরঙ্গ চ্যাট করছেন, যৌন উদ্দীপক কথা বলছেন অন্য কারো সাথে। কিংবা হয়তো দেখলেন একটু আগেই আপনাকে “ভালোবাসি” বলা মানুষটি আসলে অনেকের সাথেই ফেসবুকে Flirt করছেন, কিংবা পর্ণ পেজ গুলো নিয়মিত দেখছেন… কেমন হবে আপনার মনের অবস্থা? এত দিনের জমানো বিশ্বাস, ভালোবাসা মুহূর্তের মাঝে মিথ্যা হয়ে যাবে সব। মানুষটাকে আর হয়তো কখনোই শ্রদ্ধা করে উঠতে পারবেন না। তাই না? না পারাটাই স্বাভাবিক, কেননা ভালোবাসার অপর পিঠেই থাকে শ্রদ্ধা। আর এই শ্রদ্ধাবোধটা তৈরি হয় সঙ্গীর রচিশীলতা, আপনার প্রতি তার আবেগের সততা ইত্যাদি অনেক কিছুর অপরে ভিত্তি করেই। আর এমন পরিস্থিতিতে কেবল আপনি নন, কে কোনো মানুষরেই মনের অবস্থা একই রকম হবে। নিজেকে মনে হবে ভীষণভাবে প্রতারিত। বাংলাদেশে যখন মোবাইল ফোন বস্তুটা প্রচলিত হলো, তখন একটা হিড়িক ছিল মোবাইলে প্রেম করার। সেই হিড়িকটা বুঝি এখন ফেসবুকের ক্ষেত্রে চলছে।

কিন্তু বাস্তব অবস্থাটা হচ্ছে যে এমনটাই ঘটে চলেছে প্রতিনিয়ত। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট গুলো, বিশেষ ভাবে ফেসবুকের কারণে প্রতিনিয়ত ভাঙছে যত্নে গড়া সম্পর্ক গুলো। কেবল পশ্চিমা দেশ গুলোতে নয়, আমাদের দেশেও অহরহ ভাঙছে সম্পর্ক এই ফেসবুকের কারণেই। ফেসবুকের পৃথিবীতে আজ আর গোপন নয় কিছুই, খুব সামান্য ব্যাপারই আজকাল লুকিয়ে রাখা সম্ভব। এবং বাকি সবই প্রকাশিত সকলের সামনে। আপনি কি করছেন, কার সাথে বন্ধুত্ব হলো, কোন পেজে লাইক দিলেন, কোথায় কি কমেন্ট করলেন ইত্যাদি প্রায় সকল কিছুই দেখতে পাচ্ছে অন্যরা। আর ফলাফল? সম্পর্কের ভাঙ্গন।

কিন্তু কেন? কি সেই কারণ যার ফলে ঘটে চলেছে এসব?

ব্যাখ্যাটা সোজা! ফেসবুক বা অন্যান্য সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট গুলোতে সহজেই জড়ানো যায় প্রেমের সম্পর্কে, এবং কোনো রকম দায়বদ্ধতা থাকে না। ইচ্ছা হলে ভেঙ্গেও ফেলা যায় সহজে, একাধিক ফেক আইডি করে অগণিত সম্পর্ক গড়ে তোলা যায় নিজের আসল পরিচয় গোপন করে। বাস্তব জীবনে একাধিক প্রেমিক/ প্রেমিকা তৈরি করার চাইতে ফেসবুকে সেই কাজ করাটা অনেক বেশি সোজা। আর একারণেই দেখা যাচ্ছে বাস্তব জীবনে স্বামী/স্ত্রী ছেলেপুলে নিয়ে সুখে থাকা ব্যক্তিটাও জড়িয়ে যাচ্ছেন পরকীয়ায়। কিংবা নিজের প্রেমিক/ প্রেমিকার সাথে সুখী সম্পর্কের অধিকারী মানুষটিও সামলাতে পারছেন না আকর্ষণীয় নারী/পুরুষদের সান্নিধ্যের লোভ। বেছে নিচ্ছেন অনৈতিক একটি সম্পর্ক।

এই সমস্ত ব্যাপারটিকে আজকাল মানসিক সমস্যা হিসাবেই অবিহিত করছেন সমাজ ও মনো বিজ্ঞানীরা। কেননা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে এই ধরনের অনৈতিক কাজকে কেউ অন্যায় মনে করছে না। একজন মানুষের সাথে প্রেম বা বিয়ের সম্পর্কে জড়িত থাকা অবস্থায় ভার্চুয়ালি একাধিক ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক রাখার বিষয়টিকে তারা স্বাভাবিক ভাবেই দেখছেন। আবার অন্যদিকে নিজে এমন কাজ করার পরও যদি সঙ্গী বা সঙ্গিনী একই রকম কিছু একটা করেন, তখন সেটিই আবার তাদের সহ্য হচ্ছে না। সব মিলিয়ে খুব দ্রুত তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে সম্পর্ক গুলো। আর ফলাফল গিয়ে ঠেকছে ভাঙ্গনে।

আসুন, দেখে নেই কয়েকটি সত্য ঘটনা-

প্রায় দুই বছরের সম্পর্ক নাতাশা আর ইশতিয়াকের মাঝে। কিছুদিন যাবতই নাতাশা লক্ষ্য করছে ইশতিয়াকের মনযোগ তার দিকে অনেকটাই কমে গেছে। আগের মতন সঙ্গ বা ভালোবাসা কোনটাই মিলছে না ভালোবাসার মানুষটির কাছ হতে। ভীষণ রুচিশীল, আদর্শবান একজন মানুষ ইশতিয়াক। নাতাশার তাই সর্বক্ষণ মনে হচ্ছে সে নিজে কোনো ভুল করে ফেলল না তো? একদিন দুর্ভাগ্যবশত সুযোগ হয়ে গেলো ভালোবাসার মানুষটির ফেসবুক আইডিতে এক্সেস পাবার। আর তারপর যা দেখতে পেলো তাতে উলটে পালটে গেলো জীবনটা মুহূর্তে। তার ভীষণ আদর্শবান ভালোবাসার মানুষটি ফেসবুকে একাধিক নারীর সাথে সময় কাটাচ্ছে। নিছক বন্ধুত্ব নয় সম্পর্ক গুলো, বরং সব ক্ষেত্রেই যৌন উদ্দীপক কথা দিয়ে ইনবক্স ভরা। ফেসবুকে অসংখ্য নারীর ফলোয়ার ইশতিয়াক, যাদের প্রোফাইল ছবি গুলো আকর্ষণীয়… ইত্যাদি আর অনেক কিছুই।

আবার অন্যদিকে আছেন শাজ্জাদ সাহেব। স্ত্রী ও দুটি পুত্রকে নিয়ে সুখী সংসার তার। ভীষণ ভালো গৃহিণী তার স্ত্রী, তাকে অনেক ভালোওবাসেন। কি মনে করে একদিন হাত দিলেন স্ত্রীর মোবাইলে, ইন্টারনেটে কি এমন গেম খেলেন স্ত্রী সেটা দেখবার জন্য। যা দেখলেন, তাতে মন ভেঙ্গে গেলো মানুষটির। স্ত্রী গেম খেলেন না, বরং প্রেম করেন। শুধু তাই নয়, যাদের সাথে প্রেম করেন তারা অনেকেই কম বয়সী ছেলে। নিজের আসল নাম পরিচয় গোপন করে মিথ্যার জাল বুনে পরকীয়া করছেন স্ত্রী। নিজের মাঝে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেলেন সাজ্জাদ সাহেব। সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে স্ত্রীকে কিছুই বললেন না, নীরবে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিলেন। স্ত্রী কখনো জানতেও পারলেন না যে স্বামী পুরুষটি কিসের কষ্টে এমন হয়ে গেলেন।

ঘটনা গুলো মিথ্যা নয়, পুরো মাত্রায় সত্য। এবং এমন আরও অসংখ্য ঘটনা ছড়িয়ে আছে আমাদেরই জীবন জুড়ে। মিলিয়ে দেখুন নিজের সাথে, আপনি জড়িয়ে যাচ্ছেন না তো কোনো ভার্চুয়াল অনৈতিক সম্পর্কে? একটাই পরামর্শ দিতে পারি, যে মানুষটিকে বাস্তবে পেয়েছেন তাকে ভালোবাসুন। আর দূরে রাখুন মিথ্যা মায়ার ভার্চুয়াল সম্পর্কের অনৈতিকতা থেকে। এইসব সম্পর্ক আপনাকে ক্ষণিকের মজা ঠিকই দিতে পারবে, কিন্তু সুখ কখনোই নয়। বন্ধুত্ব হবে না কেন, অবশই হবে। তবে সেই বন্ধুত্ব হোক নির্মল আর সুন্দর।

Share Button