পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই যেতে পারেন দিল্লি

Exif_JPEG_420

কামরুল হাসান হবিগঞ্জ: নাম দিল্লি আখড়া। নামের মধ্যেই ঐতিহাসিক ছাপ। স্থানটি ভারতের দিল্লির কোনো অংশ নয়। স্বচক্ষে দেখতে চাইলে ইচ্ছাটুকুই যথেষ্ট। এ জন্য পাসপোর্ট-ভিসার ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হবে না। কারণ এটির অবস্থান হাওরসমৃদ্ধ কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার শেষ প্রান্তে কাটখাল গ্রামে। দিল্লির সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্মৃতিবিজড়িত এই দিল্লি আখড়াকে কেন্দ্র করে রয়েছে নানা গল্পকথা।

শ্রাবণ মাসের বর্ষা আর শরতের সৌন্দর্য্য বাংলার প্রকৃতিকে করেছে রূপমা। আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা মেঘ। কখনও গুড়িগুড়ি বৃষ্টি কখনও চিকচিকে রোদ।

হবিগঞ্জের কালাডোবা নামক নৌকাঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত একটি নৌকা ভাড়া করে একঝাঁক সাংবাদিকদের নৌকা ভ্রমণ। নৌকা চলছে। খাল-নদী পেরোচ্ছে। গন্তব্য সেই দিল্লির আখড়া। একেকটা হাওর ছাড়ানোর পর একেক সাংবাদিকদের প্রশ্ন আর কত দূর? ঘণ্টা তিনেক চলার পর দূর থেকে দেখা গেল কয়েকটা হিজলগাছ। তখন মনে হলো কাছাকাছি এসে গেছি।

ঘড়ির কাটায় দুপুর সোয়া দুইটা। দিল্লি আখড়ার ঘাটে নৌকা বাঁধার পর সাংবাদিকরা মাটিতে পা রাখলেন। আখড়ার পুকুরের পাড় থেকেই শোনা গেল পাখির কলকাকলি। গাছে গাছে দেশীয় সব পাখি, সঙ্গে রয়েছে অতিথি পাখিও। পুকুর পেড়িয়ে আখড়ার প্রধান গেট। গেটের কাছে জুতা খুলে আখড়ার আঙিনায় প্রবেশের নিয়ম। আমাদের কেউ কেউ জুতা নিয়েই প্রবেশ করলেন। ভেতরে যেতেই এক মহিলা সবাইকে জুতা বাইরে রেখে আসার অনুরোধ করলেন। উঠানের পাশেই আরেকটি পুকুর। আমাদের দেখে ঘর থেকে বেরিয়ে আসলেন আখড়ার সেবায়েত অনন্ত দাস বৈষ্ণব। সাংবাদিকদের সঙ্গে পরিচয় পর্ব শেষে আলাপচারিতা শুরু হলো। আখড়ার প্রধান সেবায়েত নারায়ণ দাস মোহন্ত সেদিন ছিলেন না।

অনন্ত দাস জানালেন, আখড়াটি চার-পাঁচশ বছর আগের। ওই সময় স্থানটা ছিল ঘন জঙ্গল। কেউ সহসা এদিকে আসার সাহস করত না। কিছুটা দূরেই বিথঙ্গলের আখড়া, যেটি এর চেয়েও পুরনো। সেখানকার সাধক রামকৃষ্ণ গোস্বামী এক শিষ্যকে এই জঙ্গলে পাঠান। সেই শিষ্য নারায়ণ গোস্বামী এই আখড়া প্রতিষ্ঠা করেন।

কথিত আছে, আখড়ার প্রতিষ্ঠাতা নারায়ণ গোস্বামী প্রথম প্রথম এখানে এসে সকালে নদীর তীরে বসে ধ্যান করতেন। কিছুদিন পর ওই নদীপথে যাওয়ার সময় সোনার মোহর ভর্তি একটি নৌকা ডুবে যায়। দিল্লি থেকে আসা সেই নৌকার যাত্রীরা মোহর তোলার জন্য নদীপাড়ে আসে। ডুব দিয়ে তারা দুয়েকটি মোহর তুলেও আনে। কিন্তু সেই মোহরগুলোও চোখের ইশারায় পানিতে ফেলে দেন নারায়ণ গোস্বামী। পরে নৌকার যাত্রীরা জেরা করলে তিনি সোনার মোহরগুলো মাছের ঝাঁকের মতো ভাসাতে থাকেন। এই ঘটনা দেখে আগন্তুকরা দিল্লি ফিরে যান। দিল্লির বাদশা এই খবর শুনে প্রায় তিনশ একর জমি আখড়ার নামে লিখে দেন। সেই থেকে এর নাম হয় দিল্লির আখড়া। দিল্লি আখড়ায় প্রতি বছর ৮ চৈত্র দুই দিনের মেলা বসে। শুকনো মৌসুমে পায়ে হেঁটে আখড়ায় আসতে হয়। বর্ষাকালে নৌকার কারণে যাতায়াত খুব সহজ।

দিল্লির আখড়ার ভেতরে রয়েছে নারায়ণ গোস্বামী ও তার শিষ্য গঙ্গারাম গোস্বামীর সমাধি। আরও রয়েছে ধর্মশালা, নাটমন্দির, অতিথিশালা, পাকশালা ও বৈষ্ণবদেব থাকার ঘর। বর্তমানে আখড়ায় নারায়ণ দাস মোহন্তসহ তিনজন বৈষ্ণব আছেন। আর আছে ৪০-৫০ জন শ্রমজীবী মানুষ। সবাই নিরামিষাশী। থাকেন একটি যৈৗথ পরিবারের মতো।

আখড়ার ৩৭২ একর জমির চারপাশে বিশাল এলাকা জুড়ে রয়েছে প্রায় তিন হাজার হিজল গাছ। এই হিজল গাছ নিয়ে রয়েছে চমকপ্রদ কাহিনি। এগুলো নাকি ছিল এক একটি দানব। নারায়ণ গোস্বামী দানবগুলোকে হিজল গাছে রূপান্তর করেন। হিজল গাছগুলো হাওরের এক অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভ‚মিয়া যা সবাইকে হাতছানি দিয়ে ডাকে।

দিল্লির আখড়া থেকে বিদায় নিয়ে আমরা গেলাম বিথঙ্গলের আখড়ায়। এখানে মোগল আমলে তৈরি একটা স্থাপনা থাকলেও সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তবে ইদানীং সংস্কারের কাজ চলছে। বিথঙ্গলের আখড়ার অবস্থান হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলায়। দুটি আখড়াই পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হতে পারে। হাওর, প্রাচীন স্থাপনা, সংসারবিবাগী মানুষ ও এদের জীবনযাপন-টানবে সবাইকে।

Share Button