পর্যটন শিল্পে মৌলভীবাজার

জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পুরাতন ভবন

প্রাচীনকাল থেকে মানুষ ভ্রমন করে আসছে। ভ্রমন করতে ভাল লাগে না এমন মানুষ খুব কমই পাওয়া যায়। অজানাকে জানা এবং অদেখাকে দেখার আগ্রহ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। ভ্রমন পিপাসুদের জন্য মৌলভীবাজার একটি আকর্ষনীয় স্থান।

হযরত সৈয়দ শাহ মোস্তফা(রঃ) মাজার

মৌলভীবাজারের রয়েছে, অপার পর্যটন সম্ভাবনা আছে ৯২টি চায়ের বাগান “দুটি পাতা একটি কুড়ি”র দেশ খ্যাত এ জেলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। হাওড়, নদী, খাল, বিল-ঝিল টিলা-পাহাড়, হৃদ-ছড়া, ঝর্ণাদ্বারা কি নেই এখানে। এ যেন প্রকৃতির নিজ হাতে গড়া। এখানে আছে কিছু স্থাপন ও প্রতিষ্টান যা এ জেলাকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় সংস্কৃতির দিক থেকেও এর গুরুত্ব অনেক। মৌলভীবাজার জেলার আয়তন প্রায় ২৬৮২.২৯ বর্গ কিলোমিটার।

মনু ব্রেজ

মনু নদী বিধৌত মৌলভীবাজার সদর উপজেলার দর্শনীয় স্থানের অবস্থান শহরের দুই থেকে তিন কিলোমিটার দুরত্বের মধ্যেই। শহরের কেন্দস্থলে আছে হযরত সৈয়দ শাহ মোস্তফা(রঃ) মাজার। মাজারের পাশে বেড়ি লেকের পাড়ে হযরত নুর আলী শাহ্ (রঃ) এর মাজার। মাজারের পুকুরে রয়েছে অনেক গজার মাছ।  হযরত শাহ্ মোস্তফা (রঃ) মাজারের কিছু দূর পশ্চিমে রয়েছে তাঁর পুত্র হযরত সৈয়দ ইসমাইল (রঃ) মাজার শরীফ। একাটুনা ইউনিয়নের রায়শ্রী গ্রামে রয়েছে হযরত শেখ শিহাব উদ্দিন (রঃ) এর মাজার। এ মাজারকে অনেকে গরম মাজার বলেন। প্রতিদিন অনেক ভক্ত এ মাজারে আসেন। মোস্তফাপুর ইউনিয়নের গয়ঘর গ্রামে রয়েছে খোজার মসজিদ। সুলতান শামসুদ্দিন শাহের সময় এটি নির্মিত হয়। ৫৩৩ বছর বয়সী এ মসজিদে নেকনজর নিয়ে প্রতি দিনই দর্শনার্থীদের আগমন ঘটে। কুচারমহল গ্রামে আছে হযরত শাহ্ খোয়াজ (রঃ) এর মাজার। শহরের কোর্ট রোডে আছে শাহ্ মোস্তফা(রঃ) স্কয়ার। বিকেলের সিগ্ধ আলোয় ফোয়ারার দৃশ্য মুগ্ধ করবে দর্শনার্থিদের। পাশেই আছে ¯িপ্রং কর্ণার নামে ফাষ্ট ফুডের দোকান। মনু নদী প্রকল্পের মনু ব্যারেজ লেক এলাকা পর্যটন স্থান হিসেবে আকর্ষনীয়। এর প্রাকৃতিক দৃশ্য নয়নাভিরাম। মৌলভীবাজার শহর থেকে পূর্ব দিকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরত্বে কোলাহল মুক্ত পরিবেশে এর অবস্থান। দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে ¯প্রীডবোর্ট ও নৌকা। ভাড়া করে যে কোন লোক এগুলো নিয়ে ঘুরতে পারেন। দর্শনার্থীদের জন্য সাময়িক বিশ্রামের জন্য রয়েছে দর্শনার্থী ছাউনী। সবুজ সমারোহের এ অপূর্ব স্থানটি ভ্রমন পিপাসুদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। শহর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দুরে লাউরআগা রির্জাভ ফরেষ্ট। ১৯১৬ সালে রির্জাভ ফরেষ্ট হিসেবে তৎকালিন সরকার ঘোষনা করে। উঁচু-নিচু পাহাড়ে আছে গাছের সাড়ি। সবুজ শীতল প্রাকৃতিক পরিবেশ পাখির কোলাহলে মন ভোলায়। শহরের দক্ষিনে অবস্থিত এ ফরেষ্টকে বলা হয় বর্ষিজোড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চল। আট শতাধীক একর ভূমি নিয়ে বর্ষিজোড়া পাহাড়ের বিস্তৃতি। এখানে আছে সাড়ি সাড়ি সাল ও সেগুন গাছ। পাহাড়ের নিরিবিলি পরিবেশে কিছুটা সময় নিশ্চিন্তে আনন্দে কাটানো যায়। তাছাড়া সদর উপজেলায় আছে বেশ ক’টি চা-বাগান। এর নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও সবুজ শান্ত প্রকৃতি মনমুগ্ধ করে। আর ছোট বড় ছড়াগুলোর কলতানতো আছেই। মনু ও কুশিয়ারা নদীর রূপ ও কম নয়। মৌলভীবাজার সদরের মধ্যে কুশিয়ারা নদীর তীরে পাড়ে শেরপুর নামক স্থানে প্রতি বছর পৌষ সংক্রান্তির ২দিন আগ থেকে ৩ দিন ব্যাপী মাছের বাজার বসে। এটা এশিয়া মহাদেশের মধ্যে সর্ব বৃহৎ মাছের বাজার, যা মাছের মেলা হিসেবে পরিচিত। শত বছরের পুরোনো এ মেলায় প্রায় ৩০০ খুচরা দোকান, ৪০ থেকে ৫০টি মাছের বড় আড়ৎ বসে। বড় মাছের মধ্যে বোয়াল, চিতল, রুই, কাতলা, বাঘইড় পাওয়া যায়। বাঘাইড় মাছকে স্থানীয়ভাবে বাঘ মাছ বলা হয়ে থাকে। এক একটার ওজন ৫ থেকে ৬ মন হয়ে থাকে। যার দাম হাঁকা হয় লক্ষ টাকার উপরে। বিক্রি হয় প্রায় কাচাকাছি দামে।

রাজনগর উপজেলায় কমলার রানীর দিঘী

দিগন্তজোড়া কাওয়াদীঘি হাওরের অবস্থান মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কিছু অংশ এবং রাজনগর উপজেলায়। এ বিশাল হাওড় সিলেট অঞ্চলের মৎস্যভান্ডার নামে খ্যাত। এর মাছ খুব সুস্বাধু। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখির দেখা মিলবে। বিশেষ করে শীতের সময় অতিথি পাখিদের আগমনে চারিদিক মুখরিত হয়ে উঠে। হাওরের চরকালিন দৃশ্য ও খুব মনোরম। এ হাওরে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদের দেখা মিলবে। ১৯৭২ সালে এ হাওরে কৃষক আন্দোলন সংগঠিত হয়।
রাজনগরে আছে স্তরে স্তরে সাজানো চা-য়ের বাগান। এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন ফলের বাগান। রাজনগরের পাঁচগাঁও এ আছে কমলারাণীর দিঘি। যা স্থানীয় লোকের কাছে সাগরদীঘি নামে পরিচিত। লোকমুখে শোনা যায় রাজা এ দিঘী খনন করার পর কোনো পানি ছিল না। তিনি স্বপ্নে দেখলেন রাণী দিঘীতে নামলে পানি ওঠবে। রাজা স্বপ্নের কথা কমলা রাণীকে জানালেন। রাণী সত্যি সত্যি দিঘিতে নামলেন এবং পানিও উঠল। দিঘিতে পানি উঠল ঠিকই কিন্তু রাণী আর উঠেননি। অনেক খোঁজাখঁজি করেও রাণীকে পাওয়া যায়নি। হযরত কুতুব শাহ্ (রঃ) এর মাজার সাগরদিঘির পশ্চিম পাড়ে। হযরত শাহজালাল (রঃ) সফর সঙ্গি সৈয়দ রুকন উদ্দিন (রঃ) এর মাজার বড়দল গ্রামে। হযরত শাহ্ বরখুরা (রঃ) এর মাজার ফকিরটুলা গ্রামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী শ্রীমতি লীলানাগ ১৯০০ সালের ২রা অক্টোবর রাজনগরের পাঁচগাঁও এ জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন উপমহাদেশের নারী জাগরনের পথিকৃত। বর্তমানে ঐখানে তার পৈতৃক বাড়িটি থাকলেও মালিকানা পরিবর্তন হয়েছে। পাঁচগাঁও এর দুর্গা পূজা উপমহাদেশের অন্যতম বিখ্যাত পূজা বলে সমাধিত। প্রতি বছর পূজার সময় ভারত সহ বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক লোক সমাগম হয়ে থাকে। পাঁচগাঁও এ আছে দেওয়ান কটু মিয়ার কবর। অবশ্য কোন কবরটি কটু মিয়ার তা নিদ্দিষ্ট করে কেউই বলতে পারেন না। কটু মিয়ার কাহিনী এ অঞ্চলের লোক সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। কটু মিয়া ও করফুল নেছাকে নিয়ে ইতিমধ্যে সিলেটি ভাষায় একটি ছবি নির্মিত হয়েছে।

কমলার বাগান

দু’টি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ এর রাজধানী বলা হয় শ্রীমঙ্গলকে। চা বাগানগুলোর সবুজের সমারোহ মন আকুল করে। বাংলাদেশের একমাত্র চা-গবেষনা ইনষ্ট্রিটিউট শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত। অনুমতি সাপেক্ষে এ গবেষনাগার ঘুরে দেখা যায়। এখানে আছে টি টেষ্টিং ল্যাব, প্রায় ষাট বছরের পুরোনো চা গাছ, ভেজষ উদ্ভিদের বাগান ও বিটিআরআই উদ্ভাবিত বিভিন্ন জাতের চায়ের প্রজাতি। এখানে আছে দু’টি ফুলের বাগান যা দর্শকদের আকৃষ্ট করবে। শ্রীমঙ্গল – কমলগঞ্জ সড়কের পাশে ভাড়াউড়া চা বাগান সংলগ্ন ২৫.৮৩ একর জায়গার উপর আছে টি রিসোর্স। এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য খুব মনোরম। টি রিসোর্স রেষ্ট হাউসে আছে¬¬ আধুনিক সুযোগ সুবিধা। রয়েছে সুইমিং পুল, টেনিস কোর্ট ও ব্যাডমিন্টন কোর্ট ।

মাধবপুর লেক

বর্তমানে টি রিসোর্টের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে টি রিসোর্স এন্ড মিউজিয়াম। শ্রীমঙ্গল টি রিসোর্টে আছে চা যাদুঘর। দেশের চা শিল্পের ঐতিহ্যের নিদর্শন সমূহকে সংরক্ষনের জন্য ১৬ সেপ্টেম্বর ২০০৯ তারিখে এর উদ্ভোদন করা হয়। বিট্রিশ আমলে চা বাগানে ব্যবহৃত প্রায় শতাধিক আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন সামগ্রি সংগ্রহ করে টি রিসোর্টের তিনটি ঘরের চারটি কক্ষে দর্শনার্থীদের জন্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে। টি মিউজিয়ামে আছে একাত্তরের স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে চা বোর্ডের দায়িত্ব পালনকালে বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত চেয়ার ও টেবিল।

কুলাউড়ার উপজেলাধীন পৃথিমপাশা নবাব বাড়ি

এছাড়া রয়েছে চা শ্রমিকদের জন্য ব্যবহৃত বিশেষ কয়েন, পাম্প টিউওয়েল, আয়রন বেম্ব ষ্টিক, ব্রিটিশ আমলের ফিলটার, দিকনির্ণয় যন্ত্র, কেরোসিন চালিত ফ্রিজ, চা গাছের মোড়া ও টেবিল, পাথর হয়ে যাওয়া গাছের খন্ড, লোহার পাপস, ফ্যান, টাইপ রাইটার, ফক, প্রনিং নাইফ, রেডিও, সিরামিক ঝাড়, বাট্রার ডিল, তীর ধুনক, রিং কোদাল, ব্রিটিশদের ব্যবহৃত কাঠ, ডেসিং টেবিল, কম্পাস, ঘড়ি, খাট, টেবিল, প্লান্টিং হো, ফসিল, ঘটি, গহনা, কাটা কুদাল, লোহার ফ্রেম টেবিল, সার্ভে চেইন, ব্রিটিশ আমলের বিমানের যন্ত্রাংশ, আইয়ুব খানের ব্যবহৃত গাড়ির চেচিস, রাজনগর চা বাগানের নিজস্ব কয়েন সহ বিভিন্ন সামগ্রী। যাদুঘরটিতে গেলে বাংলাদেশের প্রায় দেড়শত বছরের চা শিল্পের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হওয়া যাবে। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ভাড়াউড়া ও রাজঘাট লেক। চা বাগানের মধ্যখানে অবস্থিত ভাড়াউড়া লেকে আছে জলপদ্মের মেলা। শীতকালে অবস্থান করে বিভিন্ন প্রজাতির হাজার হাজার অতিথি পাখি। এর প্রাকৃতিক দৃশ্য খুবই চমৎকার। এখানে বানর ও হনুমানের দেখা পাওয়া যায়। রাজঘাট লেকও খুব আকর্ষণীয়। শ্রীমঙ্গলে আছে হাইল হাওর। এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অতুনীয়। শীতের মৌসুমে এ হাওরে হাজার হাজার অতিথি পাখি আসে। হাওরের মাছ, পাখি ও নৌকার দৃশ্যগুলো অবলোকন করার মত। তিনদিকে পাহাড় বেষ্টিত এ হাওর সমুদ্রের

মাধবকুন্ড জলপ্রপাত,

সবচেয়ে ছোট মেয়ে বলে পরিচিত। বাইক্কাবিল এ নির্মিত দেশের একমাত্র পাখি পর্যবেক্ষন টাওয়ারে উঠে পাখি পর্যবেক্ষন করা যায়। শ্রীমঙ্গলে শহরের রামকৃষ্ণ মিশন রোডে আছে সীতেশ বাবুর ব্যক্তিগত উদ্যোগে নির্মিত চিড়িয়াখানা। এ চিড়িয়াখানায় বিরল প্রজাতির অনেক প্রাণী আছে। উল্লেখযোগ্য পশু পাখির মধ্যে আছে সাদা বাঘ, সোনালী বাঘ, মেছো বাঘ, হরিণ, লজ্জাবতী বানর, ভাল্লুক, সোনালী কচ্ছপ, বন্য খরগোস, সজারু, বিভিন্ন প্রজাতির সাপসহ অনেক প্রজাতির দেশি বিদেশি পাখি। শ্রীমঙ্গলের নীলকন্ঠ চায়ের দোকানের দুই কিংবা পাঁচ রঙ্গের চা মুগ্ধ করবে যেকোন দর্শনার্থীকে। চা শ্রমিক রামেশের আবিস্কৃত বিভিন্ন কালারের চা ইতিমধ্যে অনেক খ্যাতি অর্জন করেছে। শ্রীমঙ্গলের নদী ছড়ায় গেলে মূল্যবান সিলিকা বালু দেখতে পাওয়া যাবে। শ্রীমঙ্গলে রয়েছে খাসিয়াপঞ্জি, তাদের সহজ সরল জীবন যাপন অভিভূত করবে দর্শনাথীদের। শ্রীমঙ্গলের লেবু, আনারস, কমলা ইত্যাদির বাগান দর্শণার্থীদের মুখরিত করবে। শ্রীমঙ্গল দেশের সবচেয়ে শীতলতম স্থান এবং সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। ভ্রমনপিপাসু ও প্রকৃতি প্রেমীদের জন্য লাউছয়াছড়া জাতীয় উদ্যান আকর্ষণীয় স্থান। শ্রীমঙ্গল উপজেলার কিছু অংশ এবং কমলগঞ্জ উপজেলার অনেকাংশ নিয়ে এর অবস্থান। এই উদ্যানে আছে হাজার হাজার প্রজাতির বৃক্ষ। বেশ কিছু বিরল প্রজাতির বৃক্ষও রয়েছে। প্রাকৃতিক গাছ ছাড়াও অনেক রকম অর্কিড দেখা যেতে পারে। এখানে বিচিত্র পশু পাখির বাস। আছে চিতা বাঘ, হরিণ, খরগোস, উল্লুক, বন মোরগসহ বিভিন্ন বিরল প্রজাতির জীবজন্তু, পশু ও পাখি। এই উদ্যানের পাশেই রয়েছে শ্যামলী পিকনিক ষ্পট। যার রয়েছে অবাক করা সৌন্দর্য।

কমলগঞ্জ উপজেলায় বীর শ্রেষ্ট হামিদুর রহমানের সমাধিস্থল

কমলগঞ্জ থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন মাধবপুর লেক। যা পর্যটকদের আকৃষ্ট করে থাকে। চা বাগানের বুক চিরে প্রবাহিত এ লেকে রয়েছে নীলপদ্মের সমাহার। চারপাশে মায়াময় চা বাগান দেখলে মনে হবে এ শুধু সবুজের দেশ। এর নৈসর্গিক সৌন্দর্য আর সবুজ প্রকৃতি সত্যি অতুলনীয়। মাদবপুরে প্রায় সাড়ে চারশত বছর আগের বিশাল একটি দিঘি প্রত্মতাত্ত্বিক সম্পদ রাজবাড়ী ও কিছু ঐতিহাসিক নিদর্শন রয়েছে। দিঘির পাড়ে প্রাচীন কিছু বৃক্ষও রয়েছে। দেশের মধ্যে কমলগঞ্জ উপজেলার সবচেয়ে বেশি মনিপুরী সম্প্রদায়ের বসবাস। তাদের রয়েছে নিজস্ব ঐতিহ্য ও সৃংস্কৃতি। মনিপুরীদের তাঁতশিল্পের খ্যাতি আছে দেশ ও বিদেশে। মনিপুরীদের জীবনধারা পর্যটকদের আকৃষ্ট করবে। প্রতি বছর মনিপুরী অধ্যুষিত মাধবপুর ও আদমপুর এলাকায় রাস পূর্ণিমা ও রথযাত্রা উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন অব্জল এমনকি আমাদের পাশ্ববর্তী দেশ ভারত, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ সহ বিভিন্ন বিভিন্ন দেশ থেকে পূণ্যর্থী ও দর্শকদের সমাগম ঘটে। এখানে এলে খাসিয়া, ত্রিপুরা, নাগা, সাওতাল, মুন্ডা, শব্দকরসহ বিভিন্ন গোষ্ঠির সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হওয়া যাবে। কমলগঞ্জে আছে ধলাই নদী। নদীর পাশেই বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের সমাধিসৌধ। তাছাড়া মাগুর ছড়া গ্যাস ফিল্ড, সমশেরনগর বিমান বন্দর, কয়লাখনি ইত্যাদি দেখার মত স্থান।

চা বাগান

বড়লেখার মাধবকুন্ডে রয়েছে দেশের সবচেয়ে উঁচু ঝর্ণা। এটি প্রায় ১৬২ ফুট উঁচু। পাথারিয়া পাহাড় বেয়ে অবিরাম সু-মধুর ছন্দ তুলে নিসর্গের মনমাতানো রূপ নিয়ে ঝর্ণার পানি পড়ছে। দূর থেকে মাধবকুন্ডের স্থানকে প্রায়টা গুহার মত মনে হয়। ঝর্ণার চারপাশের শীতল হাওয়ায় মনে এক অন্যরকম ভাললাগা কাজ করে। তবে অতি আবেগ প্রবণ না হয়ে কুন্ডের উঁচু টিলায় আরোহন ও কুন্ডের জলে সাঁতার কাটা থেকে বিরত থাকতে হবে। নতুবা যেকোন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। মাধবকুন্ডের সবুজ শ্যামলে ঘেরা আলো ছায়ায় খেলা করা প্রকৃতি অসাধারণ। প্রাকৃতিক পরিবেশে ঝিঁ ঝিঁ পোকার গুঞ্জন মন আলোড়িত করে। বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কুঞ্জনে আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠে পরিবেশ। মাধবকুন্ডে পর্যটকদের থাকা ও খাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে। মাধবকুন্ডের পাশেই আছে সরস্বতিকুন্ড। মাধবকুন্ডে দেখতে পাওয়া যাবে খাসিয়াদের বৈচিত্রময় জীবন যাপন।

চা বাগানের কারখানায় চা প্রক্রিয়াজাত করণের কাজ চলছে

খাসিয়াপুঞ্জি দেখতে অপূর্ব। আছে সুদৃশ পানের বরজ। ২০০১ সালে মাধবকুন্ডে ঝর্ণাকে ঘিরে অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্য সমৃদ্ধ বনাঞ্চল নিয়ে স্থাপিত হয়েছে মাধবকুন্ড ইকোপার্ক। যা দর্শকদের বিস্মিত করবে। বড়লেখা সদরের পশ্চিম জুড়ে হাকালুকি হাওর। পাথারিয়া পাহাড় ও ভাটেরা পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে বিশাল নিুাঞ্চল নিয়ে এ হাওরের অবস্থান। বর্ষা মৌসুমে দিগন্ত জুড়া অথৈ জলারাশি দেখলে হঠাৎ যে কারো মনে হবে সাগর। হাওরের ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ মন কারবে। এর প্রাকৃতিক দৃশ্য অতুলনীয়। একই সাথে পানির রাশি, দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড় ও আকাশের সৌন্দর্য দেখার মজাই আলাদা। পাখির কোলাহল, বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, নৌকা, জলজ উদ্ভিদ এসবত রয়েছেই। বড়লেখার পাথারিয়া পাহাড় একটি দর্শনীয় স্থান। পাথারিয়া পাহাড়ের জন্ম প্রায় কুঁড়ি লাখ বছর আগে। এ পাহাড়ে আছে দূরবীন টিলা, গগনটিলা ও রাজবাড়ি টিলা নামে তিনটি উল্লেখযোগ্য শৃঙ্গ। এ গুলোর উচ্চতা প্রায় ২৪৪ মিটার। এ পাহাড়ের অপরূপ রূপ কাছ টানবেই। রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা ও বন্য প্রাণি। আছে বিভিন্ন প্রজাতির ফলমূলের গাছ, অজস্র জাতের লতা,পাথর ইত্যাদি। অশোক দেবকাঞ্চন পারুল নীললতা, ম্যাগনেলিয়া ইত্যাদি ফুলের গাছ আছে। বন্যপ্রানির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল হাতি, হনুমান, মেছোবাঘ, বনরুই ,বানর, হরিণ, বন মোরগ ইত্যাদি। আছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। পাথারিয়া পাহাড়ে কয়েকটি ছোট ছোট ঝর্না রয়েছে। টলমলে ছড়ার পানির নিচে স্তরে স্তরে সাজানো নুড়ি পাথর দেখা যায়। ছড়ার পানিতে কাকড়া, বন্য কচ্ছপ, ইত্যাদিও দেখা যাবে। এ পাহাড়ের পাদদেশে রয়েছে কয়েকটি চায়ের বাগান। এখানে মনিপুরী, খাসিয়া ও সাওতালদের বাড়িঘর ও বৈচিত্রময় জীবন যাপন দেখা যাবে। জেলা অনান্য উপজেলার মত রড়লেখায় আছে বিভিন্ন বাগান। এর মধ্যে কমলা কাঠাল, সাতকরা, বাউফল, লেবু, আনারস ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। রড়লেখার দাসের বাজার এলাকা শীতল পাটি তৈরীর বিখ্যাত স্থান। এখানকার শীতল পাটি গ্রামের শীতল পাটি গুলোর রয়েছে মন মাতানো সৌন্দর্য। রড়লেখার সুজানগর আতর ও আগরের জন্য প্রসিদ্ধ। রয়েছে মূল্যবান আগর গাছের বাগান। বড়লেখার লাতুর সালেগড় দুর্গ একটি ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান। বৃটিশ ভারতে ইংরেজ বিরোধী সংগ্রামে এর রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। বড়লেখার লগটি গ্রামে প্রায় আড়াইশত বছরের পুরোনো মসজিদ রয়েছে। মুঘল স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত ঐতিহ্যের স্মারক এ মসজিদের নাম খুজার মসজিদ। শীতকালে মসজিদের পুকুরে অনেক অতিথী পখি আসে। বড়লেখার সালদিঘায় আছে চারশত বছরের পুরোনো মসজিদ। রড়লেখার দরগা বাজার মোকাম। এটি ৫ শত বছরের পুরোনো কবর স্থান। কতিথ আছে হযরত শাহজালাল (রঃ) সিলেট যেতে এ পথ দিয়ে সিলেট গমন করেছিলেন। তখন তিনি এ পুকুরে গজার মাছ অবমুক্ত করেন। এ উপজেলার হরিপুর এলাকায় আছে হযরত শাহজালাল(রঃ) এর সঙ্গি সাইয়্যিদ ইয়াকুব আলী (রঃ) মাজার। শোনা যায়, এ মাজারে মানত করে কচু কাটলে শত্রু সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়।
জুড়ি উপজেলায় রয়েছে হারারগজ পাহাড়। সবুজে ঘেরা চায়ের বাগান। আছে ছোট বড় ছড়ার ছড়াছড়ি। যার সু-মধুর ছন্দ মনে দেয় আনন্দ। মন মাতানো এ পাহাড়েই রয়েছে মূল্যবান ইউরেনিয়াম এর খনি। পাহাড়ী পরিবেশ মনে দেয় আনন্দ। মন মাতানো এ পাহাড়েই রয়েছে মূল্যবান ইউরেনিয়ামের খনি। পাহাড়ী পরিবেশের আকুল করা সৌন্দর্য সহজে ভুলার নয়। এ উপজেলায় আছে মনিপুরী ও খাসিয়া উপজাতি। মনিপুরী পল্লীর বিচিত্রতা অবাক করবে। রয়েছে মণিপুরী শিক্ষা একাডেমী। জুড়ীতে বাণিজ্যিকভাবে সাতকরা ও কমলার চাষ করা হয়। বাগানগুলোর দৃশ্য আকর্ষণীয়।
কুলাউড়ায় রয়েছে দেখার মত অনেক কিছুই। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় ১৯২৫ সালে কুলাউড়ার রঙ্গিরকুল গ্রামের পাহাড়ী ভূমিতে একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়। বৃটিশ ও পাক বিরোধী আন্দোলনে এর কর্মীদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। এখানে চরকায় সূতা কাটা হতো আর স্বদেশীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। এ ঐতিহাসিক স্থাপনাটি এখনও সুদৃশ্য ও সংরক্ষিত। কুলাউড়ায় আছে পৃথিম পাশা জমিদার বাড়ি। ঊনিশ শতকের সবচেয়ে বড় জমিদার নবাব আলী আমজাদ। জমিদার বাড়ীতে আছে ঐতিহ্যবাহী হোসেনী দালান। এখনও মহরমের সময় এখানে বিরাট অনুষ্ঠানাদি, তাজি মিছিল, লাটি খেলা দর্শকদের আনন্দ দেয়। মনসুর গ্রামের জমিদার মামন্দ মনসুরের বাড়ির সামনে মাটির দেয়াল দিয়ে তৈরি নয় খন্ডে বিভক্ত দিঘি আছে। যা দর্শকদের মুগ্ধ করবে। কুলাউড়ার মুরইছড়া ইকোপার্ক একটি আকর্ষনীয় পর্যটন কেন্দ্র। কর্মধা ইউনিয়নের লুথিটিলার পাদদেশে মুরইছড়া জলপ্রপাত সৌন্দর্য পিপাসুদের জন্য অনন্য স্থান। এ ইকোপার্কে মায়া হরিণ, বনমোরগ, বানর, চিতাবাঘ, বন্যহাতি, রক্তচোষা, হরিয়াল, হনুমান ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি রয়েছে। ৮৩০ একর আয়তনের ইকোপার্কটিতে বিভিন্ন ধরনের চির সবুজ ও পত্রঝরা বৃক্ষ এবং লতাগুল্ম রয়েছে। নানা জাতের গাছ গাছালিতে ছেয়ে যাওয়া এ ইকোপার্কটি যে কেই বিমুগ্ধ নয়নে উপভোগ করবে। মুরইছড়ার পাশেই আছে কয়েকটি গারো পরিবার। কুলাউড়ার কালা পাহাড় একটি মনোরম দর্শনীয় স্থান। সবুজ গাছ গাছালির মধ্যে পাখির কলধ্বনি, ঝর্ণার ধারা মন কারবে। এছাড়া কুলাউড়ায় আছে চোখ জুড়ানো চা বাগান, খাসিয়া পুঞ্জি, পানের বরজ, কমলার বাগান ইত্যাদি। মৌলভীবাজারের যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই উন্নত এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনাও ভাল। তাই অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে যে কেউ নির্দ্ধাধায় চলে আসতে পারেন।
রাজধানী ঢাকা থেকে রেল ও সড়কপথে আসা যায়। রেল যোগে ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গল আসতে হলে ২৫০ টাকা থেকে শ্রেণী বেঁধে ৩৫০ টাকা সীট প্রতি। আপনী শ্রীমঙ্গল, সমশেরনগর, কুলাউড়া, বড়লেখা রেলষ্টেশনে নামতে পারেন। রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে মৌলভীবাজারের উদ্দ্যেশে বাস ছেড়ে আসে। ভাড়া ২৫০ টাকা থেকে ৩৫০ টাকা। শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার, কুলাউড়া ও বড়লেখা সরাসরি আসা যায়। নতুবা মৌলভীবাজার এসে ভাল রেষ্টুরেন্টে বিশ্রাম করে ইচ্ছে মত সময়ে প্রাইভেট কার, সিএনজি বা লকাল বাস যোগে বেড়াতে পারেন। রেল বা বাস যোগে আসার পথে হবিগঞ্জ জেলার শেষ প্রান্ত থেকেই শুরু হবে মনোমুগ্ধকর চায়ের সাড়ি সাড়ি বাগান। বাগানের মধ্যে আকা-বাঁকা পথে চলে আসতে ভালই লাগবে মৌলভীবাজারে। থাকা খাওয়ার ভাল ব্যবস্থা অন্য কোন জায়গার চেয়ে উত্তম। এবং মৌলভীবাজারের সাধারণ মানুষের শান্তি প্রিয় ও বন্ধু সূলভ আচরণের যেকোন মানুষ মুগ্ধ হয়ে ফিরে যেতে পারবেন।
তথ্যসূত্র : কিছু নিজের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা, বিভিন্ন পত্র পত্রিকা ও স্থানীয় কিছু ম্যাগাজিন।

লেখক : শামিমা নাসরিন তরফদার, যুক্তরাজ্য প্রবাসী, ১৫ মার্চ ২০১০ইং। লেখাটি হুবহু তোলে ধরা হয়েছে।

সম্পাদনায় : এস এম মেহেদী হাসান

Share Button