দেশ বিদেশে সিজারিয়ান প্রসবের তুলনামূলক চিত্র

ডা. উম্মুল খায়ের মাহমুদা, ঢাকা: বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে সিজারিয়ান প্রসবের মাত্রা আশংকাজনকভাবে বেড়ে গেছে। এর কারণ নিয়ে দেশে তর্ক-বিতর্ক কম হচ্ছে না।
অনেকে যুক্তি দেখিয়ে বলেন, উন্নত বিশ্বে বিশেষ করে ইউরোপ আমেরিকায় তো এতো সিজার হয়না। তারা এতো বেশি সিজারের জন্য ঢালাওভাবে চিকিৎসকদের দায়ী করে থাকেন।প্রথমে পরিসংখ্যানে দেখে নিতে চাই, দেশ ও বিদেশের সিজারের সংখ্যা কেমন।
বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যু ও স্বাস্থ্যসেবা জরিপ ২০১৬ অনুযায়ী, ২০১০ সালে সিজারের পরিমাণ ১২% থাকলেও ২০১৬ সালে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৩১%। এখনো ৫০% এর বেশি প্রসব বাড়িতে হয়।২০১৬ সালে প্রকাশিত ফোর্বস ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে দেখা যায়, ২০১৩ সালে তুরস্কে প্রতি একশ জন জীবিত বাচ্চার মধ্যে সিজারিয়ান প্রসব হয়েছে ৫০.৪ জনের।একই বছর ইতালি, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, জার্মানি, কানাডা, স্পেন ও ইউকে-তে এই হার যথাক্রমে ৩৬%, ৩২.৫%, ৩২.১%, ৩০.৯%, ২৬.৩%, ২৫.২% ২৩%।
WHO এর গবেষকরা বলেন, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার কমাতে প্রতিটি দেশে কমপক্ষে ১৫% সিজার হওয়া উচিত। আমেরিকান গাইড লাইন মতে, মাত্র ১৯ ভাগ সিজার হওয়া উচিত। এর বেশি হলে তা কোন উপকারে আসবে না। বরং প্রসব পরবর্তী সময়ে জটিলতা বাড়বে।

পাশ্চাত্য দেশগুলোতে সন্তান প্রসবের যেসব সুবিধা বিদ্যমান:
পাশ্চাত্য দেশগুলোতে লেবার রুমে আল্ট্রাসনো, সিটিজি সহ নানা সুবিধা বিদ্যমান থাকায় মিডওয়াইফরা লেবার মনিটরিং করতে পারেন এবং সময়ে সময়ে ডাক্তারকে অবহিত করেন। সমস্যা হলে খুবই স্বল্প সময়ে সিজারের ব্যবস্থা করা হয়। তাৎক্ষণিক রক্ত সরবরাহ করা ও নবজাতকের ডাক্তারের ব্যবস্থা করাও সম্ভব। সেখানকার সকল চিকিৎসা ব্যয় সরকার অথবা ইন্সুরেন্স কোম্পানী বহন করে।
আমাদের দেশের প্রসূতি রোগীরা প্রসবপূর্ব সময়ে যে ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা নেন, সেই ডাক্তার তাকে সব সময় আশ্বস্ত করেন এবং ডেলিভারীও করতে চান তার হাতেই। উপরন্তু মিডওয়াইফ আমাদের দেশে অপর্যাপ্ত। বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে লেবারের এক পর্যায়ে যদি সিজারের দরকার হয় তখন ক্লিনিকগুলোতে সিজারের ব্যবস্থা করা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। ততক্ষণে মা ও বাচ্চার অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। খরচও তখন দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায়।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে এই চিত্র ভিন্ন। সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রায় সার্বক্ষণিক অভিজ্ঞ ডাক্তার থেকে শুরু করে বেশীরভাগ সুযোগ সুবিধা প্রায় বিনামূল্যে পাওয়া সম্ভব।
সেজন্য দেখা যায় প্রাইভেট ক্লিনিকে একজন প্রসূতিবিদ যতোই যত্ন করে রোগীর সেবা করুক না কেন কোন সমস্যা হলে তার সকল দায়ভার তাকেই নিতে হয়। তাই গর্ভবতী মাকে প্রাইভেট ক্লিনিকে নরমাল ডেলিভারী করানোর ব্যাপারে রোগীর আত্মীয় স্বজন ভরসা পান না।আরেকটি ব্যাপার হলো ব্যাথামুক্ত ডেলিভারী যা বিদেশে খুবই জনপ্রিয়। বিদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই ডেলিভারী বহুল প্রচলিত। যা আমাদের দেশে খুবই ব্যয়বহুল।
বিদেশে ডাক্তারদের জবাবদিহিতা যেমন বেশি, তেমনি ডাক্তারদের সুরক্ষার আইনও শক্তভাবে বাস্তবায়ন করা হয়। কোন রোগীর চিকিৎসার খুঁটিনাটি সব লিপিবদ্ধ থাকে। কোন চিকিৎসকের হাতে কোন রোগীর কোন ক্ষতি হলে সে যদি সঠিক নিয়মে থাকে তবে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারেন।
বিপরীতে আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগীর চিকিৎসার কোন প্রটৌকল বা ডকুমেন্ট লিপিবদ্ধ থাকেনা। ফলে রোগীর কোন ক্ষতি হলে স্বাভাবিক ভাবেই রোগীর আত্মীয় স্বজনের আক্রোশের শিকার হতে পারেন। আবার দোষী হয়েও আইনকে ফাঁকি দিতে পারেন। আবার নির্দোষ হলেও নিজেকে নির্দোষ প্রমাণে ব্যর্থ হতে পারেন। ফলে চিকিৎসক ও রোগীর আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে ভুল বুঝাবুঝি হতে পারে।
আশার কথা বর্তমান সরকার মিডওয়াইফকারীদের কোর্স চালু করে মিডওয়াইফকারীর সংখ্যা বাড়াচ্ছেন। বিভিন্ন সরকারী হাসপাতালে ও বেসরকারী ক্লিনিকে ফরম পূরণ করার মাধ্যমে নজরদারী বাড়ানো হচ্ছে। প্রত্যেক প্রসূতির পরিবার এমন জায়গায় ডেলিভারি করাবেন যেখানে প্রসবকালীন প্রয়োজনীয় সকল সরঞ্জামাদি থাকে ও প্রয়োজনে স্বল্প ব্যয়ে সিজার করা সম্ভব হয়।
যদি মনে কোন সন্দেহ থাকে তাহলে আপনার ডাক্তারকে সরাসরি প্রশ্ন করুন, কেন তিনি ভিন্ন পথে যাচ্ছেন। সেই সঙ্গে কেন সিজার করতে হয় তা ইন্টারনেট থেকে ধারণা রাখুন। মাতৃমৃত্যু হ্রাসে বাংলাদেশ সরকার বেশ সফল। এই সফলতায় প্রসূতিবিদসহ সকলেরই অবদান রয়েছে। তাই আমরা চাই দুর্নাম হঠিয়ে আরো সফলভাবে কাজ করতে যেন মাতৃমৃত্যু হার একেবারেই কমে যায় এবং সিজারের হার যেন সহনীয় মাত্রায় পৌঁছে।

[লেখক পরিচিতি: ডা. উম্মুল খায়ের মাহমুদা একজন প্রসূতি, স্ত্রী ও বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞ এবং সার্জন। তিনি শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, মাতুয়াইল- এ গাইনী বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। এছাড়াও রাজধানীর পান্থপথে শমরিতা হাসপাতালে তার চেম্বার রয়েছে।]

email: mahmudak50@gmail.com
অনুলেখক: আলী আদনান।
সূত্র: একুশে টেলিভিশন।

Share Button