ট্যুরিস্ট ভিসায় বাংলাদেশে এসে দুই মার্কিন নাগরিকের কাণ্ড !!

ডেস্ক রিপোর্ট : বাংলাদেশের আইনের তোয়াক্কা না করে ট্যুরিস্ট ভিসায় এসে নানা বন্যপ্রাণী নিয়ে গবেষণা করছেন দুই বিদেশিরা নাগরিক। গবেষক শাহরিয়ার রহমান সিজার ও বনবিভাগের এক কর্মকর্তার রহস্যজনক সহযোগীতার মাধ্যমে তারা চালাচ্ছে এ গবেষণা। সেই সাথে দেশের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং বন্যপ্রাণীর নমুনা বিদেশে পাচারের অভিযোগ আছে তাদের বিরুদ্ধে ।

বনবিভাগের অনুমতি না নিয়েই ২ বিদেশী ও শাহরিয়ার সিজারসহ ৩ জন মিলে বিপন্ন প্রায় বনরুইয়ের নমুনা সংগ্রহ করেছেন গত ঈদের সময়। যদিও সংবাদের অনুসন্ধান শুরু খবর জানতে পেরে প্রভাব কাটিয়ে গত ২৬ জুন বনবিভাগ থেকে তড়িঘড়ি করে নিয়ম না মেনেই অনুমতি নিয়েছেন সিজার। তবে এই অনুমতিতে সিজার কাজ করতে পারলেও বিদেশীরা কোন ভাবেই কাজ করতে পারেনা। বন আইন অনুযায়ী যা দণ্ডনীয় অপরাধ।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, গত ঈদের ছুটিতে ফাঁকা ছিল মৌলভীবাজারের কলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া উদ্যান। সে সময় পর্যটক হিসেবে ঘুরতে আসা দুই মার্কিন গবেষক স্কট ট্রাগেসার ও এলেক্স উইলস লাউয়াছড়া বনে ঢুকে নিজেরদের ইচ্ছে মত কাজ করেছেন সেই সাথে করেছেন বনরুইয়ের নমুনা সংগ্রহ। এই কাজে তাদেরকে সহযোগীতা করেছেন সিজার। লাউয়াছড়ার একজন ট্যুর গাইড নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তিনি ঈদের বন্ধে বিদেশীদের দেখেছেন বনে, ভেবেছিলেন তারা ঘুরতে আসছে।

অভিযোগ আছে এই এই দুই মার্কিন গবেষক বনরুইয়ের নমুনা সংগ্রহ করেন এবং পরবর্তীতে আরো সংগ্রহ করতে শ্রীমঙ্গলের বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনে যান কিন্তু সেবা ফাউন্ডেশন তাদেরকে সহযোগিতা করেনি জানিয়ে বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক সজল দেব জানান, কয়েকজন এসেছিল তাদের সাথে দুইজন বিদেশীও এসেছিল আমাদের বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনে। তারা বনরুই হাতে নিয়ে দেখতে চাইলে আমরা তাদের হাতে দেইনি এমনকি খাঁচা থেকেই বের করিনি।

এদিকে ঈদের সময় লাউইয়াছড়া থেকে বন্যপ্রাণীর নমুনা সংগ্রহ করে তা নিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ব্র্যাকের ল্যাবে যান তারা চেষ্টা করেন জিন সংগ্রহের। ঐ বিশ্ববিদায়লয়ের ল্যাব সহকারী আকাশ বলেন, দু’জন এসেছেন। একজনের নাম অ্যালেক্স। অপর জন হলেন গবেষক স্কট ট্রাগেসার। ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের সংরক্ষিত এলাকায়ও নিয়মিত যাতায়াত করছেন তারা।

ব্র্যাকের বায়োলজি ল্যাবে সূত্রে জানা যায়, সালমান নামের সেখানকার এক সাবেক কর্মচারীর মাধ্যমে ল্যাবে যান স্কট ও এলেক্স। তারা দেশের বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী রক্ষায় কাজ করেন বলে দাবি করে বনরুইয়ের জিন নিয়ে গবেষণা করতে চান ব্র্যাকের ল্যাবে। তবে ল্যাব খালি না থাকা ও পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি না থাকায় সেসময় তারা কাজ করতে পারেনি বলে জানিয়েছেন ল্যাব সহকারী আসমা আফজাল। এ সময় কাজের সুযোগ দেয়ার বিনিময়ে ব্র্যাক ল্যাবকে যন্ত্রপাতি কিনে দেয়ার আশ্বাসও দেন স্কট। তবে ব্র্যাক সরকারি অনুমতি পত্র চাইলে পরবর্তীতে কাগজপত্রসহ আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করবেন বলে চলে যায় তারা।

এসময় ব্র্যাকের ল্যাবে তারা ভিডিও ক্যামেরায় চিত্র ধারণ করতে গেলে বাধা দেয়া হয় বলেও জানায় তারা। পরে চলে যায় স্কট ও এলেক্স। পরে আর যোগাযোগ করেনি।

বিদেশীরা শাহরিয়ার রহমান সিজারের সহযোগীতায় শুধু লাউয়াছড়া বনে নয় তারা ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের সংরক্ষিত এলাকায় নিয়মিত যাতায়াত করেছেন। ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে তাদের যাতায়াত সিসিটিভি ক্যামেরার আওতাধীন থাকলেও তথ্য লুকানোর জন্য গত ৪ মাসের সব তথ্য কে বা কাহারা মুছে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ আছে, এ সব কাজে পেছনে এবং বিদেশীদের সহযোগী দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কাজ করা বেসরকারি একটি সংগঠন ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্সের কর্মকর্তা শাহরিয়ার রহমান সিজার। তবে সিজারের দাবি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়টির হয়ে কাজ করছেন তারা। ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্সের দাবি, সংগঠনের অগোচরে এসব করছে সিজার। ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স প্রতিষ্ঠাতা আসিফ ইবনে ইউসুফ বলেন, সিজার গত তিন মাসে সিসিএ-এর নাম ব্যবহার করে যে কাজগুলো করছে এইগুলো নিজের উদ্যোগে করছে। গত ৩ মাস যাবত ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্সের (সিসিএ) সাথে যুক্ত না হয়েও বিভিন্ন জায়গায় নিজেকে সিসিএর পরিচয় দিচ্ছে, সিসিএর হয়ে মিটিং করছে, ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছে, ভাওয়ালে যাচ্ছে, প্রোজেক্ট চালাচ্ছে।

এদিকে বন্যপ্রাণী গবেষক শাহরিয়ার রহমান সিজারের কাছিম সংরক্ষণ প্রকল্পে একটি ছবিতে এলেক্সের সঙ্গে বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ কর্মকর্তা এস এম জহির উদ্দিন আকনকে দেখা গেছে। সেখানে তাকে ক্যামেরার সামনে কথা বলতে দেখা যায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, এলেক্স তার কাছ থেকে মৌখিক অনুমতি নিয়ে সেখানে গিয়েছে এবং ডকুমেন্টারি করেছে। তবে স্কট সম্পর্কে কিছু জানেন না বলে দাবি তার। তবে স্কট ও এলেক্সের বিষয় নিয়ে সাংবাদিকদের এত মাথা ব্যথা কেন সে প্রশ্নও তুলেন তিনি। অন্য এক প্রশ্নে তিনি জানান, আমি অ্যালেক্সের সঙ্গে যায়নি। আমি যখন গিয়েছিলাম তখন সিজার সেখানে ছিল। তাই বনবিভাগের এই কর্মকর্তার দেশের আইনের প্রতি আনুগত্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে তবে কি তিনিও কোন ভাবে বিদেশীদের কাছ থেকে সুবিধাভোগী?

অনুসন্ধানে জানা গেছে বিদেশী নাগরিক স্কট বাংলাদেশে ৭ বার এসেছে এবং প্রতিবারই টুরিস্ট ভিসা নিয়ে এসেছে এবং এলেক্স ১ বার এসেছে। সিজার এতদিন ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স (সিসিএ) তে যুক্ত হয়ে কাজ করলেও এলেক্স এবং স্কটের কারোরই সিসিএতে কোন পোস্ট নাই । স্কট বাংলাদেশে বনরুই নিয়ে বিদেশী একটি প্রকল্পে কাজ করার জন্য বনবিভাগের কাছে অনুমতি চাইলেও বনবিভাগ অনুমতি দেয়নি। এর পর সে সিজারের সহযোগীতায় টুরিস্ট ভিসার এসে কাজ শুরু করেন, সিজার বর্তমানে অনুমোদন নিয়ে কাজ করলেও গত ২৬ জুনের আগে তার কোন অনুমোদন বন বিভাগ থেকে ছিলনা, অনুমোদন না পেয়েও সে নিজে বিভিন্ন বনে বিদেশীদের নিয়ে যায় এবং বনরুইয়ের নমুনা সংগ্রহ করে এবং তা সম্পূর্ণ অবৈধ ভাবে।

ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্সের (সিসিএ) এর একটি প্রজেক্টে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের সংরক্ষিত এলাকায় কচ্ছপের ডিম পাড়ে এবং অন্য কাছিমরা ডিম পারার মৌসুমে গত ১১ এপ্রিল বিভাগীয় বন কর্মকর্তাকে চিঠি দিয়ে কোন দেশী-বিদেশী কাউকে কচ্ছপ প্রজনন কেন্দ্রে ঢুকতে না দেওয়ার জন্য ক্রিয়েটিভ কনজারভেশনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোজাফর ফয়সাল অনুরোধ করেন। কিন্তু এর ৩ দিন পরেই ১৪ ই এপ্রিল সিজার বন বিভাগের অনুমতি ছাড়া এবং সিসিএ এর অনুমোদন ছাড়া কচ্ছপ প্রজনন কেন্দ্রে প্রায় ১৫ জনের মত বিদেশী নিয়ে যায়, তাদেরকে কচ্ছপ দেখায়, কচ্ছপ ধরায়, ডিম দেখায় এবং তাদের কাছ থেকে টাকা নেয় যেটার কোন হিসাব সিসিএর কাছে নেই এবং সেই বিষয়ে সিসিএ অবগত ছিলোনা।

শুধু তাই নয় , বন বিভাগের অনুমতি ছাড়া সিজার বিদেশীদের দিয়ে বন্য প্রাণী ধরানো কাজ করানো ছাড়া বিভিন্ন সময় দেশীও বিভিন্ন জনকে বন বিভাগের অনুমতি ছাড়া জঙ্গলে নিয়ে গেছে যার তথ্য বিভিন্ন ছবিতে উঠে এসেছে, এমনকি বিরল প্রজাতির অজগরের সাথে ছবি তুলিয়েছেন। ভাওয়ালে কচ্ছপ গবেষণা কেন্দ্রে স্কটকে নিয়ে যাওয়ার রেকর্ড যেনো না থাকে সেই জন্য স্কটের কোন সই সেখানকার লগ বুকে রাখ হয়নি।এদিকে বনরুই নিয়ে কাজ করার জন্য গত ২৬ জুন তড়িঘড়ি করে শাহরিয়ার সিজারকে যে অনুমতি দেয় বন বিভাগ এবং এর নেপথ্যে প্রভাবশালী একটি গোষ্টী কাজ করে।

আরোও পড়ুন

বনাঞ্চলে “শাহরিয়ার সিজার” কে অবাঞ্চিত ঘোষনা
প্রাকৃতি সৌন্দর্যের পর্যটকদের হাতছানি দিচ্ছে টাংগুয়ার হাওরসহ ২৫ স্পট
পরিকুন্ড জলপ্রপাত

Share Button