গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ফাইলপত্র গায়েব, দায় নিচ্ছে না কেউ

ডেস্ক রিপোর্ট : গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পিছু ছাড়ছে না অনিয়ম-দুর্নীতি। রূপপুর বালিশ কেলেঙ্কারির পর এবার খোদ মন্ত্রণালয় থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি গায়েব হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব নথির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কিছু উন্নয়নকাজের পুনঃদরপত্র আহ্বান এবং নিয়োগসংক্রান্ত নথি। এছাড়া আবাসন পরিদপ্তরের সহকারী পরিচালকের বিরুদ্ধে তদন্তসংক্রান্ত নথিও গায়েব হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শুদ্ধি অভিযানের আওতায় গ্রেফতার হওয়া জি কে শামীম ছিলেন গণপূর্তের ৮০ শতাংশ কাজের ঠিকাদার। জি কে শামীমকে অবৈধভাবে কাজ পাইয়ে দিয়ে লাভবান হয়েছেন এমন অভিযোগে ইতিমধ্যে বেশ কিছু প্রকৌশলীকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

সূত্র বলছে, স¤প্রতি জি কে শামীমের অধীনে থাকা উন্নয়ন কাজগুলো দ্রুত শেষ করার জন্য সেসব কাজের পুনঃদরপত্র আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রণালয়। সে অনুযায়ী নথিও প্রস্তুত করা হয়। এছাড়া যেসব প্রকৌশলী পদে নিয়োগ দরকার, সেসব পদে নিয়োগ বা পদায়নের জন্যও নথি প্রস্তুত করা হয়। এসব পদের মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও উপপ্রকৌশলীর কিছু পদ।

জানা যায়, সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রস্তাবগুলো মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট নিম্ন শাখা থেকে পাঠানো হলেও গত এক সপ্তাহেও সেগুলোর নিষ্পত্তি করা যায়নি। অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব নথি কার কাছে রয়েছে সে কথা কেউ স্বীকার করছেন না। ধারণা করা হচ্ছে, এগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে, নয়তো অসৎ উদ্দেশ্যে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন বিলম্বিত করা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে মন্ত্রণালয়ের কেউ দায়িত্ব স্বীকার করতে চাননি। গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেছেন, নথি এখনো গতকাল বুধবার দুপুর পর্যন্ত তার কাছে পৌঁছায়নি। কোথায় সেসব নথি রয়েছে, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্যও পাওয়া যায়নি। তবে তার ধারণা কোথাও না কোথাও সেগুলো আছে, হয়তো পাওয়া যাবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, প্রকৌশলী পদে পদায়ন বা নিয়োগ দিতে না পারায় মন্ত্রণালয়ের কাজকর্মে ব্যাঘাত হচ্ছে। এ ছাড়া পুনঃদরপত্র আহ্বান করতে না পারায় উন্নয়ন কর্মকান্ডেও মুখ থুবড়ে পড়ছে। প্রসঙ্গত, এই মন্ত্রণালয়ে এমন একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়েছেন, যিনি চাঁদপুরে কর্মরত থাকাকালীন সরকারের অর্জিত রাজস্ব নিজস্ব ব্যক্তিগত একাউন্টে রাখতেন। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত হলে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন এবং বিভাগীয় মামলায় তার শাস্তিও হয়।

এদিকে এই মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসন প্রতিষ্ঠান ‘আবাসন পরিদপ্তর’ও জর্জরিত ঘুষ-দুর্নীতিসহ নানা অনিয়মে। সরকারি বাসা বরাদ্দের কোনো নিয়মনীতিই মানছে না প্রতিষ্ঠানটি। বাসা বরাদ্দ পেতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গুনতে হচ্ছে ঘুষের টাকা। এভাবে অবৈধভাবে বাসা বরাদ্দ পেয়েছেন কয়েক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী। স¤প্রতি নবনির্মিত বাসা বরাদ্দের শুরুতেই শুরু হয়েছে অনলাইন জালিয়াতি। এসব ঘুষ-দুর্নীতি-অনিয়মের বরপুত্র হিসেবে পরিচিত পরিদপ্তরের সহকারী পরিচালক নূর উদ্দিন আহমেদ।
সমপ্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রীর যৌথ নির্দেশে নূর উদ্দিন আহমেদের ১০০ কোটি টাকার সম্পত্তির উৎস খুঁজতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সরকারি আদেশ অমান্য করে তিনি ৩২ বছরের চাকরিজীবনে একই কর্মস্থলে বহাল আছেন। তার নেতৃত্বে পরিদপ্তরের বরাদ্দ শাখার কয়েকজন কর্মকর্তা দীর্ঘ সময় একই শাখায় থেকে বাসা বরাদ্দের ক্ষেত্রে বিভিন্ন অনিয়ম করে আসছেন।

জানা যায়, জনপ্রশাসন ও পূর্তমন্ত্রীর নির্দেশনার সঙ্গে ৩৭ পাতার অভিযোগের সংযুক্তি পাঠানো হয়েছিল তদন্ত কর্মকর্তার কাছে। কিন্তু তা পৌঁছানোর আগেই গায়েব হয়ে গেছে। আর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে উপসচিব সাজ্জাদুল হাসানের পাঠানো একই ধরনের অভিযোগপত্র পূর্ত মন্ত্রণালয়েই পৌঁছায়নি। ওই অভিযোগপত্রে বলা হয়, সাঁট মুদ্রাক্ষরিক পদে ৮০০ টাকা বেতনে চাকরি শুরু করা নূর উদ্দিন ঢাকার পশ্চিম কাফরুল-তালতলা-আগারগাঁওয়ে একটি ফ্ল্যাট, কল্যাণপুরে আট কাঠা জমির ওপর নয়তলা ভবন, দুটি গাড়ি, ল²ীপুর জেলার নিজ গ্রামে দোতলা বাংলো বাড়ি ও ১৮ বিঘা জমি, সাভারে আড়াই কাঠা জমির দুটি প্লট, নারায়ণগঞ্জ রোডের পাশে পাঁচ কাঠার একটি প্লটসহ আরো অনেক সম্পত্তির মালিক।

গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম এ প্রসঙ্গে বলেন, সরকারি বাসা বরাদ্দে প্রচুর অনিয়ম হচ্ছে এ কথা সত্য। চাকরির মেয়াদ শেষ এবং কর্মস্থল পরিবর্তন হওয়ার পরও অনেক কর্মকর্তা বাসা দখলে রাখছেন। রাজধানীতে অনেক বাসা রয়েছে, যেগুলো কর্মকর্তাদের বসবাসের যোগ্য নয়। সবকিছু নিয়মের মধ্যে আনা হবে। বাসা বরাদ্দের আইনকেও যুগোপযোগী করা হবে।  সূত্র : ইত্তেফাক

Share Button