ঈদ মানে আনন্দ

“রমজানের তাকওয়া , ঈদের খুশি –
তব হৃদয়ে ধ্বনিত হোক দিবানিশি।”

ঈদ মোবারক,
প্রতিবছর দুই ঈদ মুসলমানদের জীবনে নিয়ে আসে আনন্দের ফল্গুধারা। এ দুটি ঈদের মধ্যে ঈদুল ফিতরের ব্যাপ্তি ও প্রভাব বহুদূর বিস্তৃত। পূর্ণ এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদ মুসলিম জাতির প্রতি সত্যিই মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে এক বড় নিয়ামত ও পুরস্কার। মুসলিম উম্মার প্রত্যেক সদস্যের আবেগ, অনুভূতি, ভালোবাসা ও মমতা ঈদের এ পবিত্র ও অনাবিল আনন্দ-উৎসবে একাকার হয়ে যায়। ঈদ মুসলমানদের জীবনে শুধুমাত্র আনন্দই নয়, বরং এটি একটি মহান ইবাদতও বটে। এর মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রেরণা খুঁজে পায়, ধনী-গরিব, কালো-সাদা, ছোট-বড়, দেশি-বিদেশি সকল ভেদাভেদ ভুলে যায় এবং সবশ্রেণী ও সব বয়সের মানুষ ঈদের জামাতে শামিল হয়ে মহান প্রভুর শোকর আদায়ে নুয়ে পড়ে।
★ঈদ শব্দটি আরবী ﻋﻴﺪ শব্দের বাংলা উচ্চারণ। ﻋﻴﺪ অর্থ খুশি, আনন্দ, আনন্দোৎসব ইত্যাদি। ফিতর অর্থ রোজা ভাঙা, খাওয়া ইত্যাদি। ঈদুল ফিতর এর অর্থ রোজা শেষ হওয়ার আনন্দ। আল্লাহর নেয়ামত লাভ করার আনন্দ। হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) যখন মদীনায় আসেন, তখন দেখেন যে সেখানকার লোকেরা বৎসরে দুই দিন আনন্দ করে, খেলাধুলা করে। তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে এই দুই দিনের পরিবর্তে আরো অনেক ভালো দুটি দিন দিয়েছেন। ১. ঈদুল আযহা। ২. ঈদুল ফিতর। (আবু দাউদ)
★ঈদের দিন ১৩টি কাজ সুন্নাতঃ-
(১) শরীয়তের মধ্যে থেকে যথাসাধ্য সুসজ্জিত হওয়া, (২) গোসল করা, (৩) মিসওয়াক করা, (৪) যথাসম্ভব উত্তম কাপড় পরা, (৫) খুশবো ব্যবহার করা, (৬) ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, (৭) ফজরের নামাজের পরই সকাল সকাল ঈদগাহে যাওয়া, (৮) মিষ্টিজাতীয় খাবার খাওয়া (ঈদগাহে যাওয়ার আগে), (৯) ঈদগাহে যাওয়ার আগে সদকায়ে ফিতরা আদায় করা, (১০) ঈদের নামাজ মসজিদে না পড়ে ঈদগাহে গিয়ে পড়া, (১১) ঈদগাহে এক রাস্তায় যাওয়া ও অন্য রাস্তায় ফিরে আসা, (১২) ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাওয়া এবং (১৩) ঈদগাহে যাওয়ার সময় তাকবির বলতে বলতে যাওয়া।
★ঈদের দিনের বর্জনীয় দিকসমূহঃ-
১. জামাতের সাথে ফরজ সালাত আদায়ে অলসতা করা ২. ঈদের দিন সিয়াম পালন করা ৩. বিজাতীয় আচরণ প্রদর্শন করা ৪. নারী-পুরুষ একে অপরের বেশ ধারণ করা ৫. নারীদের খোলামেলা অবস্থায় রাস্তাঘাটে বের হওয়া ৬. গান-বাজনা করা, অশ্লীল সিনেমা ও নাটক দেখা ৭. অযথা কাজে সময় ব্যয় করা ৮. অপচয় ও অপব্যয় করা ৯. আতশবাজি করা ১০. ঈদের সালাত আদায় না করে কেবল আনন্দ-ফূর্তি করা ইত্যাদি।
★ঈদুল ফিতরের ওয়াজিব নামাযঃ-
#নিয়্যত : নিয়্যত অর্থ মনের সংকল্প বা ইচ্ছা। কাজেই মুখে উচ্চারণ করার কোনো প্রয়োজন নেই। মনে মনে নির্দিষ্ট করতে হবে যে আমি এই ঈদের নামায ক্বিবলামুখী হয়ে এই ইমাম সাহেবের পেছনে অতিরিক্ত ছয় তাকবীরের সাথে আদায় করছি। (আরবি নিয়তঃ- ‘নাওয়াইতু আন উছাল্লিয়া লিল্লাহি তা আলা রাকয়া তাই ছালাতি ঈদুল ফিতর মায়া ছিত্তাতি তাকবীরাতি ওয়াজিবুল্লাহি তা আলা ইক্বতাদাইতু বিহাজাল ইমামি মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কা বাতিশ শারীফাতি আল্লাহু আকবার।’)
★নামাযের নিয়মঃ-
#প্রথম রাকাতঃ- ইমাম সাহেব তাকবীরে তাহরীমা (আল্লাহু আকবার) বলে নামায শুরু করবেন। এরপর সবাই সানা পড়ে নিবেন। সুবহানাকাল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা.. এরপর ইমাম সাহেব তিনটি অতিরিক্ত তাকবীর বলবেন। প্রথম দুটিতে আল্লাহু আকবার বলার সময় হাত উঠিয়ে ছেড়ে দিতে হবে। তৃতীয়টিতে হাত বেধে নিতে হবে। এরপর ইমাম সাহেব ক্বিরাত শুরু করবেন। এরপর বাকি রাকাত যথারীতি পড়া হবে।
#দ্বিতীয় রাকাতঃ- সিজদা থেকে দাঁড়িয়ে ইমাম সাহেব প্রথমে ক্বিরাত পড়বেন। এরপর অতিরিক্ত তিন তাকবীর পড়বেন। প্রতিবার হাত উঠিয়ে ছেড়ে দিতে হবে। এরপর ইমাম সাহেব রুকুর তাকবীর বলবেন। তখন হাত না উঠিয়ে ইমাম সাহেবের সাথে রুকুতে যেতে হবে। বাকি নামায অন্যান্য নামাযের মতোই।
★ঈদের খুৎবাঃ- জুমার নামাযে প্রথমে খুৎবা হয়, এরপর নামায হয়। তবে ঈদের নামাযে প্রথমে নামায হয়, পরে খুৎবা হয়। ঈদের খুৎবা সুন্নত। নামাযের পর খুৎবা শুনে ঈদগাহ/মুসল্লা ত্যাগ করা উচিৎ।
উপসংহার :
ঈদ আল্লাহর নেয়ামত। আর নেয়ামতের চাহিদা হলো এর শুকরিয়া আদায় করা। নেয়ামত পেয়ে নেয়ামতদাতার অবাধ্য হওয়া তার সাথে বেইমানী করার শামিল।
এক মাস আল্লাহর বিধান মেনে চলে পুরস্কার প্রদান দিবসে তাঁর অবাধ্যতা করার চেয়ে নিকৃষ্ট কাজ আর কী হতে পারে। কাজেই এই নেয়ামতের দিন তাঁর কোনো অবাধ্যতা যেন না হয়, সে দিকে লক্ষ্য রাখা সকল মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য।
ঈদ সাম্যের বাণী নিয়ে আসে। এদিন ধনী, গরীব, বড়, ছোটতে কোনো ভেদাভেদ থাকে না। আল্লাহর দেয়া খুশিতে মেতে ওঠে সবাই। তাই এদিন আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, গরীব-দুঃখিদেরকে স্মরণ করে তাদের সাথে খুশি বন্টন করা উচিৎ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফিক দিন। আমিন।

(লেখকঃ এম. নাসির হোসাইন)

Share Button